উৎসব এর প্রয়োজনীয়তা মানব জীবনে কি কি

উৎসব মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। সভ্যতার সূচনা থেকেই সমাজবদ্ধ জীব মানুষ একা থাকতে না পেরে একসাথে থাকার ব্যবস্থা নিজে নিজেই খুঁজে নিয়েছে।

উৎসব কি

সভ্যতা ও সংস্কৃতি এর ঐতিহ্য প্রকাশ করার জন্য যে আনন্দ অনুষ্ঠান আমরা করে থাকি তাই হল উৎসব। অনুষ্ঠানগুলো হল একটু অন্যরকম ভাবে সময় কাটানো যাকে ইংরেজি তে বলে ফেস্টিভ্যাল, ওকেজেন,ইত্যাদি।  

এই আনন্দ অনুষ্ঠান গুলোর উদ্দ্যেশ্যই হল পরিবারের সকলে একসাথে কিছুদিন সময় অতিবাহিত করা। সুখ দুঃখ নির্বিশেষে একসাথে থাকা।

এইসব অনুষ্ঠান মানেই রোজকার রুটিন থেকে অব্যাহতি।

উৎসব মানেই সকলে একসাথে থেকে আনন্দ করা। এই আনন্দ অনুষ্ঠান নানান কারনে হয়ে থাকে।

উৎসবের শুরু

প্রাচীনকালে মানুষ এই আনন্দ অনুষ্ঠান করতো তাদের প্রধান কর্মকে কেন্দ্র করে। আর তাদের প্রধান কর্ম ছিল কৃষি। এই কর্ম যাতে তারা ঠিকঠাক করে সারা বছর করতে পারে সেইজন্যই তো আয়োজন করেছিল পূজার।

সেই প্রাচীনকালে, মানুষ শক্তির পূজা করতো। মানুষ বিশ্বাস করতো সূর্য, চন্দ্র –এইসব গ্রহই প্রধান , শক্তির উৎস। তাই তারা পূজা করতো জাঁকজমকের সাথে।

ধীরে ধীরে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সভ্যতার বিকাশ হল। আবিষ্কার হল নানান যানবাহনের। মানুষ ডানা মেলে উড়তে শিখল। জনসংখ্যা বাড়তে থাকলো।

মানুষ নিজের এলাকার বা অঞ্চলের উন্নতির জন্য অন্য অঞ্চলের সাহায্য নিতে থাকলো। মানুষ বিজ্ঞানের যাদু শেখার জন্য যেতে থাকলো উন্নত রাজ্যে।

তৈরি করলো অনুষ্ঠানের সূচীপত্র। ক্যালেন্ডারে মার্ক করে রাখল সেইসব স্পেসাল দিন গুলো। সেইসব দিনে কোন কাজ হবে না, হবে শুধু আনন্দ। থাকবে ছুটি। তাই চিহ্নিত করলো সেই দিনগুলোকে লাল কালি দিয়ে।

দেশের বিশাল জনসংখ্যা সামলাতে না পেরে তৈরি হল রাজ্যের। মানুষেই ঠিক করেছিল তাদের পছন্দ মতো একজন মানুষকে হতে হবে রাজা, যার নিয়মেই হবে রাজ্যের নিয়ম। তখন থেকেই শুরু হয়েছিল রাজনীতির।

এই রাজনীতিকে কেন্দ্র করে জন্ম নিল অনেক অনুষ্ঠান।

উৎসব কতো প্রকারের এবং কি কি

উৎসব শুধু কর্ম কে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ রইল না। মানুষ ডানা মেলে উড়ার সাথে সাথে সেটিও তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করতে থাকলো।

বারোমাসে তেরো পার্বণ – বাঙালি উৎসব ছাড়া কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে। নানান অনুষ্ঠান করেই যেন বাঙালি শক্তি পায়। নানান কারনে চলতে থাকে নানান অনুষ্ঠান।

বর্তমানে জন্ম দিন এও মহা অনুষ্ঠান পালন করে থাকে সারা পৃথিবীর মানুষ।

ক্লান্ত মানুষ সপ্তাহের ওই একটা দিন, রবিবার উৎসব এর আমেজেই কাটাতে ভালোবাসে। রবিবার মানেই তো উইকেন্ড উৎসব। এইসব তো রোজকার উৎসব।

এবারে আসা যাক প্রধান ফাংসেনগুলোতেঃ

ধর্মীয় উৎসব

সব পোশাকের যেমন একই উদ্দ্যেশ্য; সব ধর্মেরও একই উদ্দ্যেশ্য। একই উদ্দ্যেশ্য হওয়া সত্বেও কতো বৈচিত্র্য পোশাকের মধ্যে! ঠিক একইরকম ভাবে, বৈচিত্র্য বিরাজমান ধর্মের মধ্যে।

যে পৃথিবীতে নানান ধর্মের মধ্যে নানান বৈচিত্র্য, সেই পৃথিবীতে উৎসবের মধ্যেও বৈচিত্র্য থাকাটাই তো স্বাভাবিক।

সব ধর্মের নিয়ম কানুন গুলো যেমন ভিন্ন; ঠিক তেমনি সব উৎসবের মধ্যেও নানান নিয়ম। তবে যে রাজ্যে যে ধর্মের মানুষের সংখ্যা বেশী, সেই রাজ্যে সেই ধর্মের উৎসবই প্রধান হয়ে ওঠে; আর বাকী ধর্মের মানুষেরাও ওই অন্য ধর্মের উৎসবে যোগদান করে।

ভারতবর্ষ হিন্দু প্রধান দেশ। এই দেশে বিভিন্ন রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। তাই তো পশ্চিমবঙ্গে যখন জাঁকজমক সহকারে দুর্গাপূজার উৎসব হয়ে থাকে; তখন উত্তর ভারতে দশেরা উৎসব পালিত হয়।

সার্বজনীন দুর্গোৎসব।
দুর্গাপূজা- বাঙালির সবচে জনপ্রিয় উৎসব।

যদিও হিন্দু বাঙালিদের সার্বজনীন উৎসব দুর্গাপূজা,  তবুও অন্য ধর্মের মানুষেরাও সামিল হয়ে থাকে এই উৎসবে।

ধর্মীয় কারনেই অর্থাৎ সুপ্রিম শক্তির প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার জন্যই এইসব উৎসবের সূচনা। কিন্তু বর্তমানে তা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিনত হয়েছে।

এখন শহরতলীতে, ভক্তিভরে পুজো না দেখে বরং বিভিন্ন মন্ডপে মন্ডপে মানুষ ঘুরে বেড়ায় প্রতিমার সাজসজ্জা কিংবা প্যান্ডেল এর চাকচিক্য দেখার জন্য।

হিন্দুদের যেমন দুর্গাপূজা ঠিক তেমনি মুসলিমদের ঈদ-উল-ফিতর। মুসলিমরা মূর্তি পুজায় বিশ্বাসী নয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের নবম মাসের সব দিনগুলোতে উপবাস করে আর সন্ধ্যেবেলা চাঁদ দেখার পর খাবার খায় অর্থাৎ ইফতার পালন করে।

পুরো এক মাস উপোসের পরের দিন ইদ-উল-ফিতর পালন করে। নতুন জামা কাপড় পরে, পরিবারের সকলে একত্রিত হয়ে একসাথে খাওয়া দাওয়া, শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকে।

খ্রিষ্টানরা যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন কেই উৎসব হিসেবে পালন করে।

এছাড়া আছে- রথযাত্রা উৎসব, দিওয়ালী উৎসব, কালী পূজা, গনেশ পূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা ইত্যাদি।

সামাজিক উৎসব

উৎসব প্রিয় বাঙালি। অন্য সব ধর্মের বা জাতের মধ্যে বাঙালির ঘরে উৎসব প্রায়ই লেগে থাকে।

  • নববর্ষ

নববর্ষে খাদ্য রসিক বাঙালি নতুন নতুন জামাকাপড় পরে মন্দিরে পুজো দিয়ে এসে বাড়ীতে বিশাল খাবারের আয়োজন করে থাকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এর মন ও বিচলিত হয়েছিল নববর্ষের আওহানে।

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষু রে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক, যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি, অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক। মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
  • জামাইষষ্ঠী

এই উৎসবের দিনটি জামাইদের জন্য স্পেশাল। পুরুষ শাসিত সমাজ এই বোধ হয় সূচনা করেছিল এই উৎসবের। যে দেশে স্বামী কে ভগবান বলে মানা হয়, সেই দেশে জামাই ও তো ভগবান তুল্যই।

এই বিশেষ দিনটিতে জামাই দের রকমারি খাবার দেওয়া হয়, নতুন জামা কাপড় দেওয়া হয়। বিয়ের সময় যেভাবে জামাই বরন করা হয়, খানিকটা সেই রকমভাবেই জামাই আপ্যায়ন করে থাকে বাড়ীর শাশুড়ি আর মহিলারা।

  • রাখী দিবস

এই দিনটিতে বোনেরা ভাইদের রাখী পরায়। ভাইদের সাথে বোনদের বন্ধন দৃঢ় হয়। ভাই রা দিদিদের উপহার দেয়।

  • ভাইফোঁটা

এই দিনটি উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে থাকে শুধুমাত্র ভাইদের জন্য। বোনেরা ভাইদের দীর্ঘায়ু কামনা করে কপালে ফোঁটা দেয়, বরন করে, আশীর্বাদ দেয়।

বাড়ীর বোনেরা রকমারি খাবার দাবারের সাথে ভাইদের উপহার ও দিয়ে থাকে।

জাতীয় উৎসব

খ্রিস্টানদের উৎসব
বড়দিন- ২৫শে ডিসেম্বর।

কিছু কিছু উৎসব সারা দেশ পালন করে থাকে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে। যেমন সেই দেশ টি যেদিন স্বাধীনতা লাভ করেছিল। আমাদের দেশে এইরকম কিছু উৎসব হল-

  • ১৫ই আগস্ট – স্বাধীনতা দিবস
  • ২৬শে জানুয়ারি- প্রজাতন্ত্র দিবস
  • ২ই অক্টোবর- গান্ধী জয়ন্তী
  • ২৫শে ডিসেম্বর- বড়দিন

হিন্দুদের উৎসব

বসন্ত উৎসব।
হোলি- রঙ উৎসব
  • ২৩শে জানুয়ারি- নেতাজীর জন্মদিন
  • জন্মাষ্টমী
  • ১২ই জানুয়ারি- বিবেকানন্দের জন্মদিন
  • ২৫শে বৈশাখ- রবীন্দ্র জয়ন্তী
  • হোলি- রঙ উৎসব

মুসলিমদের উৎসব

  • শব-ই-বরাত
  • নজরুল জয়ন্তী
  • মহরম

খ্রিষ্টানদের উৎসব

  • গুড ফ্রাইডে

এই দিনটিতে ভগবান যীশু কে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। খ্রিষ্টানদের কাছে খুব ই শোকের দিন। এই দিন টিতে তাই তারা উপোস করে থাকে।

  • ইস্টার সানডে

এই দিনে ভগবান যীশুর পুনর্জীবন লাভের অলৌকিক ঘটনাটি ঘটে। খ্রিষ্টানরা গুড ফ্রাইডে এর পরের রবিবার ইস্টার হিসেবে পালন করে।

শিখদের উৎসব

  • গুরুপরব

শিখরা বছরে দশটি গুরুপরব পালন করে। দশটি গুরুর মধ্যে কার্ত্তিক মাসে গুরু নানকের জন্মদিন এর অনুষ্ঠান বেশ কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে।

  • বৈশাখী

এই দিন শিখ সম্প্রদায়ের দশম গুরু- গুরু গোবিন্দ সিং খালসা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতি ৩৬ বছরে একবার ১৪ই এপ্রিল শিখরা এই অনুষ্ঠান পালন করে।

বোদ্ধদের উৎসব

  • বুদ্ধ পূর্ণিমা

বুদ্ধরা বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তে এই অনুষ্ঠান পালন করে। এই রাতে সিদ্ধার্থ গৌতম জন্ম লাভ করেন।

  • মাঘী পূর্ণিমা

মাঘ মাসের এক পূর্ণিমা দিনে গৌতম বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

উৎসবের প্রয়োজনীয়তা কি কি

উৎসব কে বাদ দেওয়া মানে কর্মরত জীবনের আনন্দকে ছিনিয়ে নেওয়া। শুধুই কি বাহ্যিক আড়ম্বর নাকি আরো কোন উপকার বা প্রয়োজনীয়তা আছে উৎসবের?  সেইসব কিছুই দেখে নেওয়া যাকঃ

  • উৎসব মনে এক অনাবিল আনন্দ নিয়ে আসে
  • উৎসবের দিনগুলোতে অনেক মানুষের ব্যবসা ভালো চলে
  • আত্মীয় স্বজনদের সাথে থাকা হয়
  • রোজকার কর্মরত জীবন থেকে বিরতি
  • বাচ্চাদের রোজকার রুটিন থেকে ছাড়
  • নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয়
  • কর্মরত বাবা মারা বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাতে পারে

উৎসবেরও কি নেগেটিভ দিক আছে?

বর্তমানে উৎসব গুলোতে প্রচুর অর্থের নয়ছয় হয়। আর এটাই সবচে বড় নেগেটিভ দিক। ভক্তি না ব্যবসা তে দাঁড়িয়েছে কিছু কিছু উৎসব।

এক শ্রেণীর মানুষ দুর্গাপূজার চারটি বিশেষ দিনের জন্য চারখানা নতুন ড্রেস পরে; অন্যদিকে আরেক শ্রেণীর মানুষ কি করে পরের দিন এর জন্য অন্ন জোটাবে তাই নিয়ে ভাবতে থাকে।

যে দেশে প্রচুর সংখ্যায় মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে, অর্থাভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়; সেই দেশে এই বিপুল পরিমানে অর্থ খরচ শোভা কি পায়?

তবে এই দিকগুলো ছাড়া বাকী সব কিছুই ভালো দিক। অর্থাৎ উৎসবের উপকারিতা বেশী। সেইসব গরীব মানুষগুলোও নিজেদের মতো করে আনন্দে মেতে ওঠে এই উৎসবের দিন গুলোতে।  

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট