কিভাবে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া যায়

এখনকার দিনে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় মনযোগী হতে পারে না। তাদের লক্ষ্যকে, দৃষ্টিকে বিচলিত করার জন্য অনেক কিছুই আমাদের সামনে উপস্থিত যা আগেকার দিনে এমন কি আমাদের ছোটবেলাতে ছিল না।

সেইজন্যইতো “কিভাবে পড়াশোনায় মনযোগী হওয়া যায়” তা জানা খুবই দরকার।

১৯৮০ সালে বেশীরভাগ বাড়ীতে টিভি ছিল না, মোবাইল এর জন্মই তখন হয় নি।

মেয়েরা খেলাধুলো করতো মাটি দিয়ে বানানো পুতুল দিয়ে আর দৌড়ঝাঁপ করে কিংবা নানান ধরনের খেলা যেমন –লুকোচুরি, ছোঁয়া- ছুয়ি ইত্যাদি।

ছেলেরা খেলত ফুটবল কিংবা ক্রিকেট।

তখনকার দিনে খেলা মানেই বাড়ীর বাইরে মাঠ এ যাওয়া। সন্ধ্যে নামলেই হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসা।

না পড়তে চাইলেও আর কোন কাজ না থাকায় অগত্যা পড়তে বসতেই হত। আমোদপ্রমোদের মধ্যে নানান রকমের বৈচিত্র্য ছিল না।

আমাদের সময়ে আপনার কাছে যদি বিলাসিতার কোন জিনিষ না থাকতো, এন্টারটেনমেন্ট এর জন্য ও কিছু না থাকতো, তাহলে আপনি কি করতেন? হয় আপনি রেডিও তে গান শুনতেন কিংবা নাচতেন কিংবা ছবি আঁকতেন।

আমাদের সময়ে বেশীরভাগ বাড়ীতে অভাব ছিল, শুধু বাবারাই চাকরি করতেন। আর তাই বাড়ীতে কোন জিনিষ এলে তা ভাইবোনদের মধ্যে ভাগ করে নিতে হত।

এখনকার দিনে বেশীরভাগ বাড়ীতে একটি কি দুটি বাচ্চা এবং বাবা, মা দুজনেই চাকুরিরতা। এর ফলে ভাগ করে নেওয়ার কোন কথাই ওঠে না।

উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যা আমাদের সময় কে চুরি করেছে; আমাদের মনকে বিচলিত করেছে; আমাদের জীবন কে কিছু ক্ষেত্রে সুবিধার করেছে ঠিক তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে জীবনের জটিলতা বাড়িয়ে দিয়েছে।   

এই উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার যুগে, আমাদের মনকেও স্মার্ট আর উন্নত হওয়া দরকার। তা না হলে তো প্রযুক্তিবিদ্যা আমাদের সর্বস্ব গ্রাস করে নেবে।

আমাদের মনকে স্মার্ট করে তোলার জন্য জ্ঞান এর প্রয়োজন। জ্ঞান বাড়ানোর জন্য ভীত মজবুত হওয়া দরকার। ভীত মজবুত করতে গেলে মন দিয়ে পড়াশুনো করা দরকার।

মাত্র ১২ টি স্টেপস এর মাধ্যমে কিভাবে পড়াশুনাতে মনযোগী হওয়া যায় দেখে নিন এখানেঃ

১।  পড়াশোনায় মনযোগী হতে চাইলে- পড়াশুনার পারমানেন্ট কারন খুঁজে বার করুন

পড়াশুনা করার পারমানেন্ট কারন খুঁজে বার করুন। মানে আপনি কেন পড়াশুনা শিখতে চান? শুধু কি একটা ডিগ্রির জন্য, নাকি স্বনির্ভরতার জন্য?  অন্যের ওপর নির্ভর করে সারা জীবন কাটাতে পারবেন তো? নির্ভরতা অনেকটাই সুখ কেড়ে নেয়। আর সুখ কে না চায়?

অন্যের ওপর নির্ভর করে বাঁচার আশা ছাড়ুন। যে বাবা মা আপনার পেছনে এতো খরচ করে সবচে ভালো স্কুলে ভর্তি করেন; তাদের থেকে আপনি কি শুধু নিয়েই যাবেন? তাহলে তো বাবা মা একদিন অতিষ্ঠ হবেই।

এখন যে বাবা মা আপনার দেখাশুনো করছেন, আপনিও সেই বাবা মা এর দেখাশুনো করবেন- যখন আপনি বড় হয়ে যাবেন আর বাবা মা বয়স্ক হয়ে যাবেন।

এই প্রতিজ্ঞা এখন এই মুহূর্তে করে ফেলুন। আর জানেন তো ভালোভাবে দেখাশুনো করার জন্য টাকার দরকার হয়, এমন কি বুদ্ধি আর জ্ঞান এর ও দরকার হয়?

২। জ্ঞানের খিদে বাড়িয়ে পড়াশোনায় মনযোগী হয়ে যান

পেটের খিদে মেটানোর জন্য তো ডেলি পাকস্থলিতে খাবার দেন। আর মনের খিদে কি দিয়ে মেটাবেন?

জ্ঞানের খিদে বাড়ান। জ্ঞানে পরিপূর্ণ হলে পরিষ্কার, মন সচ্ছ হয়ে যাবে।

ঠিকঠাক জ্ঞান যথাযথ সময়ে অর্জন করতে পারলে, পড়াশুনা করার প্রতি ইচ্ছা বাড়ে।

৩। অভাব আসতে সময় লাগে না, আগে থেকে সাবধান হয়ে যান

এখন হয়তো প্রাচুর্য আছে। কিন্তু টাকার প্রবাহ না থাকলে, প্রাচুর্য খুব সহজেই আমাদের ছেড়ে চলে যায়। তাই জমানো টাকার দিকে না তাকিয়ে প্রবাহের দিকে তাকান।

আপনার বাবা যদি ব্যবসা করেন, সেই ব্যবসায় উন্নতি বা নতুন প্রযুক্তিবিদ্যা আনার জন্য আপনার পড়াশুনা করাটা একান্তই দরকার।

৪। জীবনের লক্ষ্য ঠিক করুন

জীবনের লক্ষ্য যদি ঠিক করা না থাকে, তাহলে পড়াশুনা করতে ইচ্ছে করবেই বা কি করে? লক্ষ্যহীন জীবনে পড়াশুনার কোন অর্থই হয় না। পড়াশুনা এমনভাবে ভালোবেসে মন দিয়ে করবেন যেন ওই পড়াশুনা আপনাকে একদিন পুরস্কার দেয়।

শিকারি যেমন আগে শিকার কে খুঁজে নেয় আর তারপরে তীর চালায়; ঠিক তেমনি জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে নিয়ে পর পড়াশুনা করলে সেই পড়াশুনাতে সহজেই মন বসে।

জীবনের লক্ষ্য
লক্ষ্য

৫। নিজেকেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী বানান

অন্যের সাথে তুলনা করলে আপনার অন্তরের শক্তিকে ছোট করা হবে।

আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি কিছুতেই ১০০ এর ১০০ পেতে পারেন না?

যদি নিশ্চিতই হয়ে থাকেন, তাহলে কি এর পেছনে এটাই কারন- যে ক্লাসে প্রথম সেই ১০০ এর ১০০ পায় না; আর তাই আপনি ভাবছেন আপনিও পাবেন না?

তারপর একদিন যদি দেখেন যে সেই প্রথম ছেলেটি ১০০ এর ১০০ পেয়ে গেল; আর তখন কি আপনি ভাবতে শুরু করবেন যে আপনিও ১০০ এর ১০০ পাবেন?

তাহলে কি আপনার ভাবনাগুলোও ওই প্রথম ছেলেটির কৃতিত্বের ওপর নির্ভরশীল?

এইরকম রেষারেষি না করে, সর্বদা সামনের দিকে এ এগিয়ে যান।

নিজেকেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী বানান।

গত বছর আপনি যা রেজাল্ট করেছিলেন, এই বছর যেন তার চেয়ে ভালো করতে পারেন।

আর যদি আপনি খুবই ভালো ছাত্র বা ছাত্রী হয়ে থাকেন, তাহলে সর্বদা টার্গেট রাখুন ১০০ এর ১০০ পাওয়ার।

৬। এই বছরের লক্ষ্য ঠিক করুন

সারা জীবনের লক্ষ্য তো ঠিক করে নিয়েছেন। কিন্তু সে তো এক দীর্ঘ যাত্রার ব্যাপার।

অনেকগুলো ছোট ছোট যাত্রা নিয়েই তো সেই দীর্ঘ যাত্রা পূর্ণ হবে। আর এই ছোট ছোট যাত্রাগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিৎ।

যেমন ধরুন- আপনার জীবনের লক্ষ্য একজন বড় ডাক্তার হওয়া। ডাক্তার হতে গেলে তো ক্লাস ১২ এর আগে যা যা পরীক্ষা দেবেন সেইগুলোতে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট তো করতেই হবে।

আর জীবন বিজ্ঞানে সবচে ভালো করতে হবে। তাই প্রতি পরীক্ষায় আপনার টার্গেট হবে জীবন বিজ্ঞানে ১০০ এর ১০০ পাওয়ার; যাতে করে যে কোন Entrance examination এ আপনি সহজেই উত্তীর্ণ হতে পারেন।

৭। বারে বারে পড়তে বসুন, কিন্তু অল্প সময়ের জন্য

বাচ্ছারা খুব বেশী খাবার খেতে পারে না। সেইজন্য তারা বারে বারে খাবার খায় আর কম কম খায় যাতে করে তারা সহজেই হজম করতে পারে।

আর আপনি নিজে বা আপনি যার জন্য এই লিখাটি পড়ছেন, সেও পড়াশুনায় মনোযোগের ক্ষেত্রে নিশ্চয় বাচ্ছা।

শুরুর দিকে বারে বারে পড়তে বসুন আর প্রতিবার কম সময়ের জন্য পড়ুন।

যখন দেখবেন আপনি ওই কম সময়ে খুবই ভালো মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারছেন, তখন ধীরে ধীরে প্রতিবার পড়ার সময়টা বাড়ান।

৮। যে কোন একটা চ্যাপ্টার ঠিক করে নিন

যে কোন একটা চ্যাপ্টার ৩০ মিনিটস পড়বেন বলে ঠিক করুন। যদি, চ্যাপ্টারটি বড় হয়, চ্যাপ্টারটিকে ভাগ করে নিন। চ্যাপ্টারটির ১/২ বা ১/৩ অংশ পড়বেন বলে ঠিক করুন। একবার ঠিক করে নেওয়ার পর খেয়াল রাখবেন সেটা পূর্ণ করতে আপনি যেন ব্যর্থ না হন।

প্রয়োজনে আপনি ২-৩ টে প্যারাগ্রাফ ও ঠিক করতে পারেন। আপনি আপনার সাধ্যমতো পড়ার পরিমানটা ঠিক করুন।

৯। পড়াশুনোর জন্য যা যা দরকার সব কিছু পড়ার জায়গাতে নিয়ে বসুন

পড়াশুনার জন্য যা যা দরকার যেমন বই, খাতা, পেন, পেন্সিল, জ্যামিতি বক্স ইত্যাদি নিয়ে পড়ার জায়গাতে বসুন, যেন একটি বারের জন্য ও আপনাকে উঠতে না হয়। খাবার জলের বোতল ও কাছে নিয়ে বসুন।

বাড়ীর কাওকে জানিয়ে দিন যে ৩০ মিনিটস আপনি পড়তে বসবেন, তাই কেও যেন আপনাকে খোঁজাখুঁজি না করেন। 

১০। বুঝে বুঝে পড়ুন

যেটুকু পড়বেন, বুঝে বুঝে পড়বেন। যাতে ইংলিশ বুঝতে অসুবিধে না হয়, কাছে ডিক্সেনারি নিয়ে বসবেন।

বইএর প্রতিটি পাতা আপনি যদি মনোযোগ দিয়ে পড়েন, আপনি নিজেই সবকিছু বুঝতে পারবেন। আর এর পরেও কিছু যদি বুঝতে না পারেন , একই বিষয়ের ২-৩ টে বই রাখবেন।

তাও যদি বুঝতে না পারেন, তাহলে হাইলাইট করে রাখুন যাতে করে পড়া ছেড়ে যখন উঠবেন, অন্য কোন সোর্স থেকে যেন বুঝে নিতে পারেন।  

১১। লিখে লিখে পড়ুন

কিছু পুরানো খাতা নিয়ে বসুন। একটা প্যারাগ্রাফ পড়ার পর ওই খাতাগুলোতে না দেখে লিখতে থাকুন। লিখা হয়ে গেলে পর বই এর সাথে একবার মিলিয়ে নিন, সব পয়েন্টগুলো লিখেছেন তো? যদি কিছু মিস করে ফেলেছেন, তাহলে সেইগুলো আবার পড়ে নিন।

লিখে লিখে পড়
লিখার অভ্যেস

১২। নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন

৩০ মিনিটস পর পড়ার জায়গা থেকে উঠে যান। এতক্ষণ মন দিয়ে পড়ার জন্য নিজেই নিজেকে কিছু গিফট দিন, বা নিজের পছন্দের জিনিষটি খান।

তারপর ৫ মিনিটস এর জন্য, আপনি যা যা পড়লেন সেইসব নিয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন। আর দেখুন যে সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন কিনা।

যেসব প্রশ্নের উত্তর আপনি দিতে পারছেন না, পরের বার যখন আবার ৩০ মিনিটস এর জন্য পড়তে বসবেন, সেইসব প্রশ্নের উত্তরগুলো আগে একবার দেখে নিন।

পরীক্ষা
টেস্ট

ওপরে উল্লেখযোগ্য সব পয়েন্টগুলো আপনি যদি অনুসরণ করেন, তাহলেই মাত্র ২-৩ মাসের মধ্যেই আপনার মধ্যেকার পরিবর্তন আপনার রেজাল্টের মধ্যে ফুটে উঠবে।

এইসব স্টেপস অনুসরণ করার আগে পজিটিভ মনোভাব নিয়ে এগোবেন কিন্তু। ডাক্তারবাবু যখন ওষুধ দেন, তখন আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন এই ভেবে যে ‘ওষুধতো খাচ্ছি, সেরেই যাবো’।

ঠিক তেমনি নিশ্চিন্ত মনে এই স্টেপসগুলো অনুসরণ করতে শুরু করুন। ফল অবশ্যই পাবেন। যেমন আপনি পড়া মনে রাখতে পারবেন, তেমনি পড়ার প্রতি আগ্রহ ও বাড়াতে পারবেন।

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট