পড়াশোনার চাপ অনলাইন নাকি অফলাইনে বেশী?

যুগ বদলেছে। সিলেবাস বদলেছে। যুগ যেমন উন্নত হয়েছে , আমাদের শিশুরাও উন্নত হয়েছে। সত্যিই কি উন্নত হয়েছে? প্রচুর পরিমানে তথ্য সিলেবাসের মধ্যে ঢুকিয়ে জোর করে চাপ দিয়ে বাচ্চাদের শেখালেই কি তারা উন্নত হয়ে যায়? পড়াশোনার চাপ কি উন্নতির লক্ষণ?

অনেকেই আবার বলতে থাকেন- পড়াশোনার চাপ থাকলেই ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে। আর পড়াশোনা করলেই তো উন্নতি হয়।

কথাটা একদম ফেলে দেওয়া যায় না। কিন্তু যে চাপ উন্নতি ডেকে আনে সেই চাপ টা একটু অন্য ধরনের।

প্রতিটি অধ্যায় পড়ানোর পর যদি একটা পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে সেই চাপে ছাত্রছাত্রীরা অধ্যায়টি ভালো করে পড়বে।

এইরকম চাপ থাকলে পড়াশোনা ভালো হয়। কিন্তু তারা তো এই ধরনের চাপ না, অন্য ধরনের চাপে ভোগে।

এখন আবার অনলাইন ক্লাস হওয়াতে সেই চাপ শরীরের চেয়ে মনের ওপর বেশী প্রভাব ফেলেছে।

প্রথমে দেখে নেওয়া যাক ছাত্রছাত্রীরা কি ধরনের চাপে থাকে।

পড়াশোনার চাপ কি ধরনের?

বিভিন্ন ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন ভাবে চাপের মুখে পড়ে। এমন কি অনেকে শেষে হতাশ হয়ে পড়ে। বাবা মা তা টেরও পান না।

এক সুপ্ত হতাশা বাচ্চাটিকে আস্তেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই জমে থাকা হতাশাও বড় হতে থাকে।

কিন্তু কিসের এই চাপ? কি করলে এই পড়াশোনার চাপ কমানো যাবে?

১। একই সাথে বেশী কিছু মনে রাখতে না পারা

সবার মনে রাখার ক্ষমতা সমান না। হয়তো বাচ্চাটি পড়েছে অনেক খানি। কিন্তু দিনের শেষে আপনিই যদি আপনার বাচ্চার বা আপনার ছাত্রছাত্রীকে প্রশ্ন করেন, সে আর উত্তর দিতে পারছে না। এমনটা হতেই পারে।

যখন সে উত্তর দিতে পারে না তখন সে ভাবতে থাকে যে তার দ্বারা কিছু হবে না। এতো পড়ল, তাও সে উত্তর দিতে পারলো না- এই না পারার কষ্ট তার মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে থাকে।

পজিটিভ শক্তি যেমন পজিতিভিটিকে আকর্ষণ করে ঠিক তেমনি নেগেটিভ শক্তিও নেগেটিভিটিকে আকর্ষণ করে।

এইক্ষেত্রে খতিয়ে দেখতে হবে যে বাচ্চাটি কিভাবে পড়াশোনা করে। তার পড়ার পদ্ধতিটিকে বদলাতে হবে। প্রয়োজনে বাবা মা কে মাঝে মাঝেই পড়া নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

২। পড়তে ভালো না লাগা

কারো গল্প বই পড়তে ভালো লাগে আবার কারো কোন বইই পড়তে ভালো লাগে না। কারো ছবি আঁকতে ভালো লাগে, কারো আবার সবসময় খেলতে ভালো লাগে।

জোর করে যদি কেউ পড়াশোনা করে, তখন তো সেটা চাপই হয়। আপনাকেই যদি কোন কাজ আপনার অফিসে দিনের দিন পর দিন আপনার মনের বিরুদ্ধে করতে হয়, তাহলে তা আপনার ওপরেও চাপ সৃষ্টি করবে।

কিন্তু উপায় কি? পড়াশোনা তো করতেই হবে। কেউ যদি বড় হয়ে খেলোয়াড়ও হতে চায়, তাহলে তাকেও কিন্তু পড়াশোনা করতেই হয়।

চেষ্টা করুন যাতে আপনার বাচ্চা বা ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় ইন্টারেস্ট পায়। তার জন্য নীচের উপায়গুলো ফলো করুন-

  • আপনিও বাচ্চার সাথে পড়ুন।
  • সময় না হলে খাওয়ার টেবিলে, বাচ্চার সাথে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করুন, কিন্তু এমন প্রশ্ন করবেন না যার উত্তর আপনার বাচ্চাটি দিতে পারবে না।
  • লিখে লিখে পড়ার অভ্যেস করান।

৩। অন্যমনস্ক হওয়ার জন্য দিনের শেষে কিছুই না পড়ার অনুভূতি

আপনার বাচ্চা কি অনেকক্ষণ ধরে বই নিয়ে বসে থাকে কিন্তু সেই অনুপাতে রেজাল্ট আপনি পান না? আর সেইজন্যই সবাইকে বলতে থাকেন যে আপনার বাচ্চার বুদ্ধি কম?

বাচ্চাটি যখন পড়াশোনা করে, তখন কি আপনি খেয়াল রাখেন অন্ততপক্ষে মাঝে মধ্যে? বাচ্চাটি অন্যমনস্ক হয়ে যায় না তো? বাচ্চাটিকে আপনি বকাবকি করে শান্ত করতে পারেন, কিন্তু তার মন কে আপনি শান্ত করতে পারবেন না। আপনি যতই বকাবকি করবেন, তত বেশী তার মন চঞ্চল হবে।

তাই লক্ষ্য রাখুন সে যেন অন্যমনস্ক না হয়ে যায়। ভালোভাবে তাকে বুঝিয়ে বলুন কিন্তু বকাবকি করবেন না।

৪।  ভালোবাসা না পাওয়া

সন্তান কে ভালোবাসে না- এমন বাবা মা হয় নাকি? হয় না, তা আমি জানি। হলেও তা ব্যতিক্রম এর মধ্যেই পড়ে।

আপনি হয়তো বলবেন ভালবাসি বলেই তো তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

কিন্তু আপনি ভুল করছেন। ভালো তো বাসেন, কিন্তু প্রকাশ করেন না কেন? আপনি যদি প্রকাশ না করেন,উলটে বকতে থাকেন, তাহলে বাচ্চাটি তো ভাববেই যে তার বাবা মা তাকে ভালো বাসে না।

ভালোবাসার অনেক ক্ষমতা। বাচ্চাটির দোষ গুলো না খুঁজে তাকে ভালবাসুন। ভালো বাসতে বাসতে তাকে পড়ান।

দেখবেন-বাচ্চাটির পড়াশোনার চাপ অনেক কমে গেছে। আর তার সাথে আপনারও আপনার বাচ্চাটিকে নিয়ে যে একটা চাপ ছিল, সেই চাপও মিলিয়ে গেছে।

৫। অনলাইন পড়াশোনা

অনলাইন মানেই তো ভারচুয়েল। টিচার পড়িয়ে যাচ্ছেন। টিচার খুব ভালোই পড়াচ্ছেন।

কিন্তু উনি যে শিক্ষা সবার দিকে ছুঁড়ছেন, তা কি সবার মধ্যে ঢুকছে, তা কি সব বাচ্চাদের বোধগম্য হচ্ছে? কোন বাচ্চাকে খুব বোঝাতে লাগে, আবার কাউকে একবার বললেই বুঝে যায়।

আর এখানে টিচারের কিছু করার নেই, বিশেষ করে অনলাইন টিচারদের। অফলাইন হলে, টিচার বুঝতে পারতেন যে কারা তার কথা শুনছে আর কারা শুনছে না আর সেইমতো ব্যবস্থাও নিতে পারতেন।

অনলাইন পড়াশোনা মানেই তো বাবা মা এর চাপ বেড়ে যাওয়া। যতদিন অবধি অনলাইন পড়াশোনা চলছে, ততদিন অবধি বাবা মা কেই বেশির ভাগ দায়িত্ব নিতে হবে।

আপনার বাচ্চা যদি একবার বলাতে বুঝতে না পারে, তাহলে চিন্তা করবেন না। আগামীকাল যে পড়াটা স্কুলে পড়ানো হবে, আপনিই তা আজই বাচ্চাকে একবার হলেও পড়িয়ে রাখবেন। যাতে করে সে ক্লাস টা ফলো করতে পারে।

পড়াশোনার চাপ অনলাইন নাকি অফলাইনে বেশী?

অনলাইন পড়াশোনাতে নেই কোন শারীরিক পরিশ্রম

অফলাইনে বাচ্চার শারীরিক পরিশ্রম হত বেশী, খেলাধুলো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, একসাথে সবাই মিলে টিফিন খাওয়া, একে অপরের সাথে টিফিন শেয়ার করা- এইসব কিছুর অনুভুতিই আলাদা। টিচারদের কাছে বিভিন্ন রকম এক্টিভিটি তে অংশগ্রহণ করা। এপ্রিসিয়েশেন পাওয়া। এইসব আবার অনলাইনে হয় নাকি?

অনলাইন পড়াশোনাতে সঠিকভাবে ইভালুএট করা যায় না

বাচ্চাদের অনলাইন স্কুলেও দেখলাম- টিচার হটাত করে প্রশ্ন ছুঁড়ছে। শুধুমাত্র চেক করার জন্য যে বাচ্চারা তার কথা ফলো করছে কিনা? কিন্তু বাচ্চাটি তো কিছুই শোনে নি। শুনবেই বা কি করে? বাড়ীর মধ্যে যা আওয়াজ! কখনো তার বাবা মা খুব জোরে কথা বলছে, আবার কখনো বাসনের আওয়াজ।

বাচ্চাটি উত্তর দিতে না পারায়, তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো বাচ্চাটির মা।

অথচ একবারও ভেবে দেখল না যে এই উত্তর দিতে না পারার জন্য তারাই দায়ী।

আরও একটি উদাহরন দেওয়া যাক। ক্লাস এইটে পড়ে বাচ্চাটি। অনলাইন পরীক্ষা।

বাড়ীর নানান রকমের আওয়াজ যাতে না আসে, বাচ্চাটি মাকে বলে যে তার পরীক্ষা আছে; তাই সে রুমের দরজা লাগিয়ে পরীক্ষা দেবে। মা এর আর সময় কোথায়? মা এক কথায় রাজী।

পরীক্ষা শুরু হল। প্রশ্নপত্র দেওয়া হল। সব কিছু অনলাইন। সময় দেওয়া হয়েছে ৪০ মিনিট। প্রাইভেট মাস্টারের কাছে হয়াটস এপ এ মেসেজ পাঠাল বাচ্চাটি। সব প্রশ্নগুলো ফটো তুলে পাঠিয়ে দিল। প্রাইভেট টিচারকে বলল- “এর উত্তরগুলো এক্ষুনি লাগবে স্যার”।  

প্রাইভেট টিচার সল্ভ করে কোন অপ্সেন টা সঠিক তা মেসেজ করে দিলেন। সব প্রশ্নই তো MCQ টাইপের। এর ফলে বাচ্চাটি ফুল মার্কস পেয়ে গেল।

কিভাবে উত্তর টা এলো টা জানার প্রয়োজনও মনে করলো না। বাবা মা ও রেজাল্ট জেনে খুব খুশী।

আবার কোথাও দেখেছি- ক্লাস টু তে পড়ে বাচ্চাটি। টিচার কিছু জিগ্যেস করছেন বাচ্চাটিকে।

বাচ্চাটির মা সাইড থেকে বলে দিচ্ছেন। বা বাচ্চাটির পরীক্ষাতে তার মা ই তাকে সাহায্য করছেন।

বাচ্চারা তো সত্যিই বাচ্চা। তারা এখনো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তাই তারা বুঝতে পারে না যে তারা কঠিন চাপের মুখোমুখি হতে চলেছে। যখন আবার অফলাইন পড়াশোনা শুরু হবে, তখন আপনার বাচ্চা সেই চাপ নিতে পারবে তো?

অনলাইন পড়াশোনাতে বাবা মা এর সঠিক ভূমিকা যদি না থাকে, বাচ্চার চাপ আরও বেড়ে যাবে

অনলাইন পড়াশুনো তে বাবা মা কে বেশী চাপ নিতে হয়। বাবা মা এর দেখা উচিৎ বাচ্চা ঠিকঠাক পড়াশোনা করছে কিনা।

যদি এই অনলাইন পড়াশোনার যুগে, বাবা মা একদমই বাচ্চাকে ছেড়ে দেন, তাহলে সেই বাবা মা কেও এক কঠিন চাপের মুখোমুখি হতে হবে খুব শীঘ্রই।

অনলাইন পড়াশোনাতে সঠিকভাবে ইভালুএট করা যায় না। এর ফলে যেদিন অফলাইন পরীক্ষা হবে, সেদিন প্রতিটি বাচ্চার জ্ঞান সম্পর্কে টিচাররা জানতে পারবেন।

তাই প্রতিটি বাবা মা এর কাছে আমার বিশেষ অনুরোধঃ

  • বাচ্চাদের চিট করতে শেখাবেন না।
  • প্রাইভেট টিচার কেও সাহায্য করতে বারন করুন।
  • পরীক্ষার সময়ে ল্যাপটপ দিন, মুবাইল দেবেন না।
  • পরীক্ষার সময়ে আপনিও সাহায্য না করার শপথ নিন।
  • বাচ্চাটিকে তার চোখের যত্ন নিতে বলুন। বেশী করে ভিটামিন A খাওয়ান, নিয়মিত ব্যায়াম করা আর খেলাধুলো করার দিকে নজর দিন।
  • বাচ্চার জন্য একটা পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন।

আর এইসব কারনেই তো অনলাইন পড়াশোনাতে বেশী চাপ। বাচ্চারা হয়তো আজ টা বুঝতে পারছে না। কিন্তু শীঘ্রই টা বুঝতে পারবে।

আর এইজন্যই বাবা মা এর আরও বেশী সচেতন হওয়া দরকার।

অনলাইন পড়াশুনোর সাইড এফেক্ট কি কি ?

  • বাচ্চা ফাঁকি দিতে শেখে। পরীক্ষার সময়ে কারো সাহায্য নিয়ে লিখার চেষ্টা করে।
  • চোখের ওপর খুব চাপ পড়ে। তাই চোখে জলের ঝাপটা নিতে বলুন বাড়ে বাড়ে।
  • একটানা অনেকক্ষণ মুবাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে থাকায় বাচ্চাটির মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়।
  • খুব কম বয়সেই, বাচ্চাগুলো অনেক কিছু অপারেট করতে শিখে যায়। এর ফলে মুবাইল টা তার জীবনে একটা দরকারি জিনিষে পরিণত হয়।
  • বাচ্চারা মিথ্যে বলতে শেখে।
  • যখন অনলাইন ক্লাস থাকে না, তখনও মিথ্যে করে বলতে থাকে যে অনলাইন ক্লাস আছে আর তারপর মুবাইলে বন্ধুদের সাথে চ্যাট করতে থাকে।

তাই প্রতিটি বাবা মা কে বলবো- প্লীজ, আপনারা দেখুন- আপনাদের বাচ্চারা কিভাবে পড়াশোনা করছে, কিভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষার সময়গুলোতে একদমই সাহায্য করবেন না।

মনে রাখবেন- আজ আপনি অনলাইন পরীক্ষার দউলতে বাচ্চাটিকে সাহায্য করে এগিয়ে দিতে পারছেন-একথা সত্য। কিন্তু আগামীকাল যখন একদিন হটাত করে অফ লাইন পরীক্ষা হবে, তখন আপনার বাচ্চারা ভালো রেজাল্ট করতে পারবে তো?

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট