পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য কি কি হওয়া উচিৎ

পরিবার হল যেখানে আমাদের শুরু আর আমাদের শেষ। সেই পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে লিখতে হবে ভাবি নি কখনো। প্রচুর মানুষ যখন তার শিকড় কে ভুলে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে গিয়ে পিতা মাতার ওপর মানসিক অত্যাচার করে থাকে; তখন তো একজন নাগরিক হিসেবে কলম ধরতেই হয়।

পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য

একজন আদর্শ সন্তানের নীচের কর্তব্যগুলো পালন করা উচিৎ-

১। পিতা মাতার বার্ধক্য বয়সে খেয়াল রাখুন

কথায় আছে-“আপনি যা দেবেন, তাই ফিরে পাবেন”। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আপনি যদি আপনার পিতা মাতার খেয়াল না রাখেন, আপনিও আপনার সন্তানের থেকে যত্ন পাবেন না যখন তার প্রয়োজন পড়বে।

তাই পিতা মাতার বার্ধক্যের সময়ে তাদের যত্ন নিন। তাদের ভালো লাগা, না লাগার ওপর গুরুত্ব দিন। তাদের সমস্যাগুলো শুনুন। তাদের কি কি জিনিষের প্রয়োজন টা জেনে নিয়ে সেসব এনে দিন।

২। অর্থ দিয়ে সাহায্য করুন, ফোনে রেগুলার কথা বলুন

আপনি কি বাবা মায়ের খেয়াল রাখতে পারেন না? আপনি কি কর্মসূত্রে বাড়ী থেকে দূরে থাকেন? আপনার বাবা মা কি আপনার কাছে শহরে থাকতে চান না?

আপনি কি সমস্যায় আছেন? চাকরি সামলাবেন নাকি বাবা মা কে দেখবেন?

এইখেত্রে, আপনি প্রায়ই আপনার বাবা মা এর কাছে যান। ছুটি পেলেই চলে যান সেখানে। বাবা মা কে নিয়ে বেড়াতে যান যদি অর্থের সমস্যা না থাকে। বাবা মা এর সাথে একটা জয়েন্ট একাউন্ট রাখুন।

মাঝে মাঝে সেই একাউন্টে কিছু টাকা জমা করুন।

কি ভাবছেন? আপনার বাবা তো পেনশেন পান, তাহলে টাকা দেওয়ার কি দরকার?

হ্যাঁ, যদি আপনার বাবা পেনশেন পান, তাহলেও টাকা দেবেন। এই টাকা আপনার বাবা মা এর মন ভালো রাখবে। এই টাকা আপনার সাথে আপনার বাবা মা এর সম্পর্ক দৃঢ় করবে।

৩। পিতা বা মাতাকে একলা না রাখা

যদি আপনার পিতা মাতার সামর্থ্য আছে কাজ করার, তাহলে ওরা দুজনে একটা বাড়ীতে থাকতে পারেন। কিন্তু যদি আপনার পিতা মাতার বার্ধক্য এমন পর্যায়ে যে তারা সব কাজ নিজে করতে পারেন না, তাহলে কিন্তু তাদের একা থাকতে দেবেন না।

আবার যদি আপনার পিতা বা মাতার যে কোন একজন আছেন, কিন্তু কাজ করতে পারেন সেক্ষেত্রেও তাকে একা রাখবেন না।

বার্ধক্য শরীরের চেয়ে বেশী মনকে গ্রাস করে নেয়। তাই একা থাকা কিছুতেই যাবে না। যদি আপনার পিতা বা মাতা একলা এক বাড়ীতে থাকেন, তাহলে আপনি তাকে আপনার কাছে নিয়ে যান।

আর বছরে একবার হলেও সবাই মিলে নিজের জন্মভূমিতে আসার চেষ্টা করুন। 

৪।  পিতা মাতা কে ভালো রাখার জন্য স্ত্রী কে বা স্বামী কে প্রয়োজনে শাসন করা

বর্তমান সমাজে, স্বামী স্ত্রী দুজনেই কর্মরত। ব্যস্ত পরিবার। সবাই ছুটছে। একটা কিসের জন্য যেন তাড়া লেগে গেছে সবার মধ্যে।

আপনি কি আপনার স্ত্রীর জন্যই আপনার বাবা মা কে আপনাদের সাথে রাখতে পারছেন না? আপনি কি আপনার স্ত্রীকে অনেক বুঝিয়েছেন? আপনার স্ত্রী কি কিছুই শুনছেন না?

আপনি কি আপনার স্ত্রীর বাবা মা এর খোঁজ নেন? কোন প্রত্যাশা না রেখে আপনি কি তাদেরকে ফোনে করেন?

নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে থাকুন আর দেখুন তো আপনার স্ত্রীর মত বদলায় কিনা?

  • আপনার স্ত্রীর বাবা মা কে প্রায়ই ফোন করুন।
  • আপনার স্ত্রীর পরিবারের দায়িত্ব নিন।
  • উনাদের শরীরের দিকে খেয়াল রাখুন। উনাদের পূজাতে নতুন জামা কাপড় কিনে দিন।
  • মাঝে মাঝেই উনাদের আপনার বাড়ীতে নিয়ে এসে রাখুন। ভালো ভালো খাবার বানিয়ে উনাদের খাওয়ান।

এইসব করতে পারলে আপনি দেখবেন-

আপনার স্ত্রীও তাই করছেন-

  • আপনার স্ত্রীও আপনার বাবা মা এর খেয়াল রাখছেন।
  • আপনার বাবা মা কে আপনার বাড়ীতে নিয়ে এসে তাদের সেবা করছেন।

তাইতো সেবা পাওয়ার আগে সেবা দিতে হয়।

আপনি কি ভাবছেন যে পুরুষ মানুষ কেন সেবা করতে যাবে? এই রকম ভাবনা মন থেকে মুছে ফেলুন। এখনকার দিনে কাজের মধ্যে লিঙ্গভেদ হয় না। তাই আপনি যেসব কাজ আপনার স্ত্রীর থেকে আশা করছেন, সেইসব কাজ আপনি আগে করুন।

দেখবেন আপনার এই সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

৫। সন্তানদের সাথে পিতা মাতার বন্ধন বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া

আপনি কি অত্যধিক সচেতন আপনার সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে? আর তাই কি আপনি তাদের কে আপনার পিতা মাতার সাথে সময় কাটাতে দেন না?

এমনটা ভুল করেও করবেন না। এমন টা করলে আপনার সাথেও এমনটাই হবে। আপনার সন্তানদের উনাদের সাথে মিশতে দিন। দাদু –নাতির সম্পর্কে চিড় ধরাবেন না। দাদু- নাতির সম্পর্ক দৃঢ় হলে সন্তানের মানসিক বিকাশ ঘটে।

তবে হ্যাঁ, এতাও লক্ষ্য রাখুন যে আপনার সন্তানেরা পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে শুধু দাদু থাম্মির সাথেই সারাটা দিন কাটাচ্ছে না তো?

৬। স্ত্রী বা স্বামীর কথায় পিতা মাতাকে দেশে একা রেখে বিদেশ না যাওয়া

আপনার স্ত্রী কি সংসারের চাপ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আপনাকে বিদেশ যাওয়ার জন্য জোর করতে থাকে, কিংবা মানসিক চাপ তৈরি করতে থাকে?

আপনার বাড়ীতে প্রায়ই আপনার বাবা মা, ভাই বোন আসে বলে কি আপনার স্বামী বিদেশ যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে?

হুট করে কোন বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না।

দেশের নাগরিক হয়ে দেশের মধ্যেই চাকরি করার চেষ্টা করুন। নিজের পিতা মাতা কে বার্ধক্যের সময়ে একলা করে দেবেন না কিংবা বৃদ্ধাশ্রমের কথা ভুল করেও ভাববেন না।

বৃদ্ধাশ্রমে তারাই যায় যাদের সন্তানেরা মৃত; যেমন অনাথ আশ্রমে তারাই যায় যাদের বাবা মা মৃত। আপনি কি আপনাকে মৃত বলে ঘোষণা করতে চান? আপনি কি আপনার দায়িত্ব এড়াতে চাইছেন?

এমনটা করলে –আপনার প্রতিও কেউ কোনরকম দায়িত্ব নেবে না। তাই কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বার বার ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন।

সন্তানের প্রতি কর্তব্য

১। কোন অবস্থাতেই বাচ্চার ওপর গায়ে হাত লাগিয়ে মারধোর করা বাঞ্ছনীয় নয়

ফোঁস করুন; কিন্তু ছোবল মারবেন না। শাসন করুন; কিন্তু মারবেন না। আপনি যা যা করবেন, সেই সব কিছুই বাচ্ছার অবচেতন মনে সংগৃহীত থেকে যায়।

আপনি হয়তো ভাবছেন- অন্যায় করলে তো মারতেই হবে। আপনাকেও অন্যায়ের ফল হিসেবে পেতে হয়েছিল আপনার পিতার মার। কই তাতে আপনার ওপর তো কোন বাজে প্রভাব পড়ে নি?

তাহলে এখনকার বাচ্চাদের বেলা কেন মারা যাবে না?

আপনি ভুল করছেন? প্রাচীনকালে, যে কোন মেশিনই মজবুত ছিল। এখন সব কিছুতে নানান ভেজালের জন্য, মেশিনগুলোর মধ্যেও সফটনেস, স্টাইল বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশী কিছু সহ্য করতে পারে না- শারীরিকভাবেও না আবার মানসিক ভাবেও না। 

২। বাচ্চাকে ছোটবেলা থেকেই ভালো করে বোঝান

যখন আপনি বীজ টা সবে সবে লাগিয়েছেন, তখনই সেই বীজ এর যত্ন নিন। যেমন ধরুন- মাটি টা পরিষ্কার করুন, প্রত্যহ জল দিন, ইত্যাদি।

ঠিক একইরকম ভাবে, আপনিও আপনার বাচ্ছাকে ছোটবেলা থেকে সঠিক পথে গাইড করুন। বড়দের সাথে কিরকম ব্যবহার করতে হয় – টা শেখান।

৩। বাচ্চাকে উপযুক্ত পরিবেশ দিন

ব্যাক্তি বড় হওয়ার ক্ষেত্রে, জিন এর যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে; ঠিক তেমনি, পরিবেশও খুবই দরকারই ভূমিকা পালন করে।

বাচ্চার রুমটাকে বাচ্চার মতো করে সাজিয়ে তুলুন। পড়াশোনার পরিবেশ গড়ে তুলুন। প্রত্যহ সন্ধ্যায় প্রার্থনা করার অভেস্য করুন।

আপনি যা যা করবেন, বাচ্চাটিও তাই তাই করবে। তাই আপনি কিরকম পরিবেশ গড়ে তুলছেন তার ওপর খেয়াল রাখুন।

৪। বাচ্চার সামনে নিজের বাবা মা এর যত্ন নিন, সেবা করুন

বাচ্ছার সামনে যে কোন জটিল পরিস্থিতিও সাবধানে সামলাবেন। বাচ্চার সামনে, আপনি আপনার পিতা মাতাদের অসম্মান করবেন না, বরং সম্মান না করলেও বাচ্চার সামনে টা অভিনয় করুন। তা না হলে, আপনার নেগেটিভ টাস্কগুলো বাচ্চার মধ্যে প্রবাহিত হবে।

৫। বাচ্চা কে সঠিক পথে চালনা করুন

বাচ্চাকে সঠিক পথে গাইড করুন। সে তো কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ- তা জানে না। সে তো জীবন যুদ্ধে নতুন ড্রাইভার এর মতো। ভুল পথে, ভুল ভাবে গাড়ী চালাতে শিখালে, জীবনে আঘাত আসার সম্ভাবনা তো থেকেই যায়।

৬। সন্তানের ভালো লাগা আর ভালো না লাগা কে গুরুত্ব দিন

সন্তানের ভালো লাগা আর ভালো না লাগার ওপর গুরুত্ব দিন। আপনি যত গুরুত্ব দেবেন, আপনার বার্ধক্যে আপনি সেইসব ফিরিয়েও পাবেন।

৭। সন্তানের সম্মুখে সবসময় পজিটিভ কথা বলুন

সন্তানের সামনে ভুল করেও নেগেটিভ কথা বলবেন না। সন্তান পড়াশোনায় ভালো না হলেও, তাকে উৎসাহ দিন। তাকে বলুন যে সে খুব ভালো, কিন্তু আরও ভালো হতে হবে। পরের বছর আরও ভালো হবে।

গাছ যখন শিকড় থেকে আলাদা হয়ে যায়, তার ব্রাইটনেস বা তার অস্তিত্বও যেমন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়; ঠিক তেমনি যে জন তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে গিয়ে থাকে এই ইউনিভার্স ও তাদের সরিয়ে দিয়ে থাকে কিংবা তারা সেই একই ব্যাথায় ভবিষ্যতে ভুগতে থাকে।

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

2 thoughts on “পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য কি কি হওয়া উচিৎ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট