বাচ্চাদের রাগ কমানোর সহজ কিছু উপায়

কর্মরত স্বামী স্ত্রীর একমাত্র সন্তান। নিউক্লিয়ার ফেমিলি। “কে মাসি, কে পিসি/ কাকেই বা আর চিনি”- এই তো অবস্থা আজকালকার শিশুদের। বিশাল বড় ফ্ল্যাট। রুম হয়তো ২-৩ টে। একা শিশুটি কি করবে আর খুঁজে পায় না। তাইতো বাচ্চাগুলো রেগে যায় আর তখন বাবা মা কেই বাচ্চাদের রাগ কমাবার উপায় খুঁজতে হয়।

“বাবা মা দুজনেই সকাল ১০টার মধ্যে বেরিয়ে যায় বাড়ী থেকে। মা ফিরে রাত্রি ৭ টায় আর বাবা কোনোদিন ৯টা, কোনোদিন ১০ টা, ১১টাও হয়েছে মাঝে মাঝে।

এক অসহায় শিশু থাকে পেট দের সাথে আর একটা মাসির সাথে। সেই মাসি টিকে শিশুটিকে দেখা শুনো করার জন্যই রাখা হয়েছে।

বাচ্চাদের রাগ এর কারন

অনেকেই আবার দুষ্টু বাচ্চাই পছন্দ করেন। দুষ্টুমি না করলে সে কি আর বাচ্চা হয় নাকি? বিভিন্ন মানুষের রুচি, ভালো লাগা সব কিছুই বিভিন্ন।

বিভিন্ন বাচ্চাও বিভিন্ন প্রকৃতির। সত্যি কি অপূর্ব বৈচিত্র্য? বিভিন্ন জিন এর সমন্বয়ে বিভিন্ন বাচ্চার জন্ম। যেন জিনের ওপর পারমুটেশেন এবং কম্বিনেশেন খেলছেন স্বয়ং ঈশ্বর।

নানান কারনে বাচ্চারা রেগে যায়। যদি আপনার বাড়ীতে ২-৩ টে বাচ্চা থাকে আর আপনি যদি দুটো বাচ্চার একজন কে ভালো বলেন, অন্যজনের মনে রাগ বাসা বাঁধতে পারে।

আপনি যদি বাচ্চা কে বাধ্য করেন আপনার মতো করে চলতে, তাহলেও বাচ্চাটি রেগে যাবে।

আপনি যদি বাচ্চাটিকে দিয়ে কোন কাজ জোর করে করা করান, বাচ্চাটির মনে অভিমানের পাহাড় জন্মাবে আর তা শীঘ্রই সেই রাগ আউট বারস্ট হয়ে যাবে।

তবে রাগ মনের কোনে জমে থাকার চেয়ে আউটবাস্ট হওয়ায় ভালো।

বাচ্চাদের রাগ কমানোর উপায়

বাচ্চাদের রাগ নিয়ন্ত্রন
বাচ্চাদের রাগ

১। আশেপাশের পরিবেশ ঠিক রাখুন

চারিপাশের পরিবেশ টা সুন্দর রাখার দায়িত্ব তো আপনার যাতে করে আপনার বাচ্চার মধ্যে রাগ হিংসা বাসা না বান্ধে। যেমন মাটিতে বাজে সার দিলে গাছে পোকা জন্মে, ঠিক তেমনি আপনি ভালো পরিবেশ না দিলে বাচ্চাদের মনে নানান সমস্যা দেখে দেবে।

২। উৎসাহমূলক কথা বার্তা বলুন

শিশুটি কিছু ভেঙ্গে ফেলেছে? আপনি কি অতিষ্ঠ হয়ে আরো দুটো বাজে কথা বলে দিলেন? “তোর তো শুধু ভাঙাই কাজ। তোকে আজ শেষ করে ফেলবো। তোর দ্বারা জীবনে কিচ্ছুই হবে না।“- এইসব কথাই কি বলতে থাকেন?

তাহলে কিন্তু আপনি একদম ভুল পথে হাঁটছেন। এইসব কথাগুলো আপনি কিন্তু অন্যভাবেও বলতে পারতেন। যেমন ধরুন-

“বাঃ! এতো গায়ের জোর তোমার? তোমাকে তো তাহলে বড় অসুরদের এইভাবে মারতে হবে। পারবে তো? তার আগে একবার এই কাজটা করে দেখাও তো?”

এইসব বলে পর আপনি একটা শক্ত কোন জিনিষ তার কাছে দিয়ে তাকে বলুন –“ এইটা ভাঙ তো দেখি, পারো কিনা।“

এইভাবেই শিশুটির মনে উৎসাহ জন্মাতে হবে যে তার কিছু তো গুন আছে।

আবার কোনোদিন কিছু ছিঁড়ে দিয়েছে? আপনি তাকে বকাবকি করছেন?

এইভাবে বলুন তো- বাঃ! তুমি খুব সুন্দরভাবে ছিঁড়তে পারো তো। তাহলে আএই সাদা কাগজ টাকে একটু এই শেপ এ ছিঁড়ো তো। “

“আচ্ছা, ছিঁড়ে ফেলেছো, এবার এই ছেঁড়া কাগজটাকে আবার এই শেপে ফোল্ড করো তো।“

ঠিক যেভাবে কাগজের নৌকো বানায়, সেইভাবে নির্দেশ দিতে থাকুন।

আর তাকে বলুন- “ তুমি খুব সুন্দর ফোল্ড ও কোরতে পারো তো। দেখো –তোমার মধ্যে কতো গুন আছে- তুমি খুব শক্ত জিনিষ সহজেই ভেঙ্গে দিতে পারো, মানে তোমার গায়ের জোর আছে, আবার খুব সুন্দরভাবে ছিঁড়তে পারো এবং ফোল্ড ও করতে পারো।“

দেখবেন শিশুটির মনের জোর ক্রমশই বাড়ছে, তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ছে।

৩। শিশুদের দিকে মনোযোগ দিন

শিশুটির সঙ্গে যত বেশী সময় কাটাবেন ততই তাড়াতাড়ি আপনি শিশুটির রাগ দূর করতে পারবেন। সময় এক মুল্যবান জিনিষ। একজন বাচ্চার কাছে তার বাবা মায়ের সান্নিধ্যই সবচে দামী, আর সবচে বড় ওষুধও।

৪। শিশুটির খিদে পাই নি তো?

শিশুটির খিদে পাই নি তো?
শিশু

অনেক বাচ্চা আছে যারা খিদে পেলে বুঝতে পারে না। তারা তাই খিদে পাওয়ার কথা কখনোই তার মা বাবা কে জানায় না। তারা সেই অবস্থায় একটুতেই রেগে যায়।

আর যখন সে রেগে যায়, তখন সে নেগেটিভ কাজকর্ম করতে থাকে। তাই আপনি লক্ষ্য রাখুন তার খিদে পেয়েছে কিনা। পেট ভর্তি থাকলে, সবারেই মন ভালো থাকে, খুশী থাকে।

৫। শিশুটিকে ইগনোর করবেন না

অনেক সময়ে দেখা গেছে- বাড়ীতে কোন গেস্ট এসেছে। সেই সময়ে আপনারা বাড়ীর বাচ্চাদের অবহেলা করেন। আপনি গেস্টদের আপ্যায়নে এতোই ব্যস্ত যে বাচ্চাটির কোন কথায় শুনছেন না।

এমন কি কখনো হয় নি? বাড়ীতে প্রচুর অতিথি সমাগমে, বাচ্চার কথা আপনার কানে যায় তো?

৬। শিশুটিকে ভালো কাজে ব্যস্ত রাখুন

আপনি যদি সময় না পাচ্ছেন, কোন কারনে ব্যস্ত আছেন তাহলে আপনার কাজের আগে শিশুটিকে  ভালো কোন কাজে ব্যস্ত রাখুন।

না, টেলিভিশেন নয় কিন্তু। কিছু বানাতে দিন, কিছু আঁকতে দিন।  

৭। সবার সামনে শিশুটিকে নিয়ে বাজে রকম সমালোচনা করবেন না

মনে রাখবেন- বড়দের মতো ছোটদেরও সম্মান আছে। তাই অন্যদের সামনে ওদের দুষ্টুমিগুলো বলবেন না। জানেন তো, মাঝে মাঝে ভালো মিথ্যে বলা ভালো হয়ে থাকে।

আমি জানি, আপনার বাচ্চা খুব দুষ্টু। সবসময় কিছু না কিছু সমস্যা তৈরি করেই থাকে।

কিন্তু তা সত্বেও আপনি অন্যজনের সামনে বলুন যে- “ আপনার বাচ্চাটি খুব শান্ত। আপনার সব কথায় শোনে। অন্য বাচ্চাদের মতো দুষ্টুমি একদমই করে না।“

এই পজিটিভ কথাগুলো ওর মনের মধ্যে প্রভাব ফেলবে।

৮। শিশুটিকে নিয়ে শিশুটির সামনে নেগেটিভ কথা বলবেন না

নো নেগেটিভ কথা
শিশুদের সামনে -নো নেগেটিভ কথাবার্তা।

এমনকি শিশুটির সামনেও ওর নিন্দা করবেন না। শিশুটির নিয়ে সমস্যাগুলো আপনি আপনার বাড়ীর বড় কারো সাথে কিংবা ডাক্তারের সাথে আলোচনা করতে পারেন।

তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়- এইসব সমস্যার ওষুধ ডাক্তারদের কাছে থাকে না, বাবা মা এর কাছে থাকে। 

৯। শিশুটির ভালো দিকগুলোর প্রশংসা করুন

নিন্দা তো চলবেই না, বরং শিশুটির প্রশংসা করুন। আবার লক্ষ্য রাখবেন কিন্তু খুব বেশী বাড়াবাড়ি করে বলবেন না কিন্তু। শিশুদের আত্মসম্মানে লাগে যখন ওরা বুঝতে পারে যে ওদের কে উপহাস করা হচ্ছে।

তাই সমতা বজায় রেখে শিশুটির প্রশংসা করুন।

১০। যেসব কাজকর্মে শিশুটি রেগে যায় সেইসব কাজ না করার চেষ্টা করুন।

আপনার বাচ্চা কি গান নাচ করতে ভালবাসে, কিন্তু ছবি আঁকতে একদম পছন্দ করে না? তাহলে তাকে ছবি আঁকতে বলবেন না। তাকে গান, নাচ করতেই উৎসাহ দিন।

আর বড় হওয়ার সাথে সাথে আপনি তার পাশে বসে সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকুন। দেখবেন কয়েক বছর পরে তার ছবি আঁকতেও মন চাইবে।

১১। নিজেকে শান্ত রাখুন

সবচে জরুরী হল – নিজেকে শান্ত রাখুন। আপনার বাচ্চা রেগে গেলেও আপনি রাগবেন না। এটা আপনাকে সব সময় মনে রাখতে হবে। সে একটু জোরে কথা বলতেই পারেন। কিন্তু চেষ্টা করবেন “তুমি” দিয়ে বলার।

এতে খুব জোরে বকলেও , সেই বোকার মধ্যে ধার থাকে না। কিন্তু “ তুই” দিয়ে বললে সেই ধার দ্বিগুন বেড়ে যায়।

ওই ওপরে উল্লিখিত ১১ টি উপায় অবলম্বন করেও কি আপনি বাচ্চাদের রাগ কমাতে পারছেন না? তাহলে রাগ না কমিয়ে কিছুক্ষণের জন্য রাগটিকে পজ করে রাখুন। দেখে নিন কিভাবে বাচ্চাদের রাগ কে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রন করবেন-

বাচ্চাদের রাগ কিভাবে নিয়ন্ত্রন করবেন?

দুষ্টু বাচ্চা কেই বা চায়? একটু আধটু দুষ্টু তো সবাই চায়, সেই দুষ্টুকে তো দুষ্টু মিষ্টি বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু ধরুন আপনি আপনার স্পাউসের সাথে বাচ্চাকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট এ গেছেন।

সেখানে গিয়ে আপনার বাচ্চা আইসক্রিমের জন্য অধৈর্য হয়ে পড়েছে। সে কি চিৎকার? মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে সে কি কান্না!

এই সময়ে মিথ্যে হলেও আপনি আপনার বাচ্চাকে বলুন যে আপনি তাকে আইসক্রিম কিনে দেবেন, এই রেস্টুরেন্ট এ আইসক্রিম পাওয়া যায় না।

প্রত্যেকবার বাচ্চা যা চাইবে, তাই দেবেন না। কখনো কখনো কথা ঘুরিয়ে দেবেন, কখনো কখনো তার বদলে অন্য কিছু দেবেন আবার কখনো সেই জিনসটাই দেবেন কিন্তু বেশ কয়েক মাস পরে দেবেন।

আপনার প্রতিক্রিয়া

আপনার বাচ্চা যতই দুষ্টুমি করুক না কেন, আপনাকে ধীর স্থির থাকতেই হবে। আমরা বাবা মা রা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের কে স্থির রাখতে পারি না। আমরা উত্তেজিত হয়ে যায়।

না, আপনাকে একদমই উত্তেজিত হওয়া চলবে না। আপনি আপনার বাচ্চার দুষ্টুমির প্রতিক্রিয়া একলা এক ঘরে আয়নার সামনে দেখান।

আর বাচ্চার সামনে জোর করে নিজেকে পজিটিভ মাইন্ডেড করে রাখুন।

কখন আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ

এমনও কিছু বাচ্চা আছে যাদের রাগ কমানোর প্রয়াস আপনি অনেকদিন ধরে প্রানপনে চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না। আপনি যতই ভালো করে বলুন না কেন, বাচ্চা কিছুতেই শুনছে না।

আপনি সবরকমভাবে চেষ্টা করেছেন। মন থেকে ভালোভাবে হাসি মুখে চেষ্টা করেছেন।  তাও আপনার বাচ্চার রাগ কমাতে পারেন নি?

তাহলে শীঘ্রই ডাক্তার দেখান। অনেক সময় শরীরের মধ্যে হরমোনের ডিসবেলেন্সের জন্যও বাচ্চার রাগ বেড়ে যায়।

বাচ্চা কি খুব সমস্যার তৈরি করছে? তাহলে ওপরে উল্লিখিত স্টেপসগুলো ফলো করে দেখুন। ফল অবশ্যই পাবেন। দেখবেন কয়েক মাসের মধ্যে বাচ্চার রাগ একদমই কমে গিয়েছে।

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট