মৃত্যু ভয় কেন হয় এবং তা দূর করার উপায় কি

মৃত্যু ভয় কি থাকা ভালো, নাকি ভালো না? মৃত্যু ভয় কি একটি রোগ? যদি মৃত্যু ভয় রোগ হয়ে থাকে, এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি? কি কি কারনে মৃত্যু ভয় হয়ে থাকে?এইসব কিছু নিয়ে আলোচনা করবো এই টপিকে।

আপনার কি সব সময় মনে হয় এই বুঝি আপনি মারা গেলেন? একটু শরীর খারাপ হলেই কি ভাবেন যে এই বুঝি শেষ দিন? আপনার বন্ধু স্থানীয় কেউ মারা গেলে আপনার কি মনে হয় আপনিও এইরকম হটাত করে কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যাবেন?

আপনার বয়স কি ৭০ এর ঊর্ধ্বে? আর মৃত্যুভয় প্রত্যহ আপনাকে দংশন করতে থাকে? নাকি আপনি কিছু খারাপ কাজ করতে যাচ্ছেন? আর তাই আপনার মনে হচ্ছে ধরা পড়লেই বিপদ আর সেই বিপদ থেকে মৃত্যু?

মৃত্যু ভয় কেন হয়

অতিরিক্ত ভয়

যা কিছু অতিরিক্ত তাহাই বিষাক্ত। বিষাক্ত জিনিস সব সময় ক্ষতি ডেকে আনে। দুঃসাহস যেমন ভালো নয়, ঠিক তেমনি অতিরিক্ত ভয়ও ভালো নয়। জীবনে সব কিছুর মধ্যে সমতা বজায় রাখাই শ্রেষ্ঠ।

মৃত্যু নিয়ে কি আপনার অতিরিক্ত ভয় হয়? মৃত্যুর আগেই কি আপনি বহুবার মৃত্যু বরন করেন? মৃত্যু তো সকলের হবে। জন্মিলে মরিতে হইবে/ অমর কে কোথা রবে?

জন্ম যখন হয়েছে, মৃত্যু তখন নিশ্চিত। কিন্তু মৃত্যু বরন করার সময় ও তারিখ কি আপনার কাছে জানা? আপনি মনের মধ্যে যা ভাবেন বা আশঙ্কা করেন তা কি সত্যই বাস্তবে হয়? যদি তা না হয়, তাহলে এই অতিরিক্ত ভয় কেন?

এই অতিরিক্ত ভয় আমাদের আনন্দ কেড়ে নেয়, আমাদের জীবন কে অস্থির করে তোলে। আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি। আমাদের ওষুধের প্রয়োজন পড়ে।

আর আপনার বয়স যদি ৭০-৭৫ এর ঊর্ধ্বে হয়ে থাকে, তাহলে এই ভয় প্রতিটি মুহূর্তের যে মুল্যবান রূপ তা বুঝতে আপনাকে অক্ষম করে তুলবে। এর ফলে প্রতিটি মুহূর্ত আপনার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠবে। 

মৃত্যু ভীতি রোগ

যে কোন ভয় যদি অতিরিক্ত পরিমানে হয়ে থাকে, তখন তা রোগের আকার নেয়। যে কোন ভয়ই খুব বাজে। ভয় তো এক নেগেটিভ শক্তি। এই নেগেটিভ শক্তির পরিমান যখন বেশী হয়ে পড়ে, তখনই আপনি অন্যদের কাছে রোগী নামে চিন্নহিত হবেন।

মৃত্যু ভয় এমন এক রোগ যার ওষুধ আপনার কাছেই আছে। আমাদের মনের রোগের ওষুধ আমাদের কাছেই থাকে। তবুও এতো মানুষ কে হাসপাতালে যেতে হয় কেন? কারন বেশীরভাগ মানুষ নিজের হৃদয়ের খনি থেকে সেই ওষুধ খুঁজে পান না।

মৃত্যু ভয় লাগার কারন

এই মৃত্যুভয় দূর করার উপায় গুলো জানার আগে, আপনার এটা জানা আবশ্যক যে কি কি কারনে আপনার মধ্যে মৃত্যুভয় সঞ্চারিত হয়? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন কি কি কারনে আপনার মৃত্যু ভয় হয়?

আপনি কি অতীতে কোন খারাপ কাজ করেছেন, আর সেইজন্য ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় আপনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে? ধরা পড়লেই আপনার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত এটা আপনি ভালভাবেই জানেন, আর সেই কারনেই কি মৃত্যু ভয়ে ভীত আপনি? যদি এটাই কারন হয়, তাহলে মৃত্যুকে হাসি মুখে বরন করুন আর ঈশ্বরের কাছে কি উত্তর দেবেন আপনার ওই কুকীর্তির তা তৈরি করে রাখুন?

আপনি কি দুর্গম জায়গায় বেড়াতে যেতে পছন্দ করেন আর আপনি এও জানেন যে এইসব জায়গায় ঘুরতে গেলে অনেকেই মৃত্যু বরন করে থাকে?

আপনার শরীরে কি টুকটাক সমস্যা লেগেই থাকে? আর এই কারনেই কি আপনার মনে হয় আপনার কোন বিশাল রোগ হয়েছে, আর সেই রোগের কারনে শীঘ্রই মৃত্যু হয়ে যাবে?

আপনার অতীতে আপনি কি কোন বড় এক্সিডেন্ট এর সম্মুখীন হয়েছেন? তখন কি মৃত্যু কে সামনে থেকে দেখেছেন? আর সেই ভয় আজও আপনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে? আপনি কি ভাবছেন আবার একটা এক্সিডেন্ট এর কথা যেখানে আপনার মৃত্যু হবে?

আপনার বয়স কি ৬০-৭০ এর মাঝামাঝি কিম্বা তারও বেশী? আপনার সব বন্ধুরা কি পরলোক গমন করেছেন? আর আপনি এখনো সুস্থ শরীরে বেঁচে থেকেও শুধু ভাবতে থাকেন এই যে – ‘ওরা সবাই চলে গেল, আমিও কাল ই পরলোক গমন করবো?’ তাই কি ছেলেমেয়েদের সামনে সবসময় বলতে থাকেন যে – ‘যাওয়ার তো সময় হয়ে গেছে, আর আমাদের ওপর ভরসা না করে বাঁচতে শেখ। আমরা এখন অনিশ্চিত।’

মৃত্যু ভয় কেন হয়?

আমরা বেশীরভাগই আরামপ্রিয়। আরাম জনক একটা জীবন এ এসে গেলে আর নতুন জীবনে বা নতুন রাস্তায় হাঁটতে চায় না; কারন নতুন রাস্তায় হাঁটতে গেলেই মনে নানান প্রশ্ন জাগে। নতুন রাস্তা টা কি ভালো হবে?

ঠিক সেরকমভাবেই জন্ম নেওয়ার সময়ে আমরা প্রত্যেকেই খুব কেঁদেছি। আর সেই কান্নার মাধ্যমে বোঝা যায় যে আমাদের মনের মধ্যে খুব ভয় থাকে জন্মের পরে এই মর্ত্য লোক কে নিয়ে। তারপরে ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যায়। একটা আরামজনক জীবন এ সুখদুঃখ নিয়ে জড়িয়ে পড়ি।

দুঃখ আছে জানি, কিন্তু দুঃখের টাইপ গুলো আমাদের সকলের কাছে জানা। আমরা সকলেই জানি যে কোন সমস্যায় পড়লে কি রকমের দুঃখ আছে। সেইজন্যই আমরা কেউই এই জীবন ছেড়ে যেতে চায় না।

মৃত্যুর পরে কি হবে তা আমাদের সকলের কাছে অজানা। আমরা প্রত্যেকেই অজানা কে স্বাগত করতে ভয় পাই।

মৃত্যুভয় দূর করার উপায়

মৃত্যু ভয় এর নানান রকম কারন দেখলাম। কিন্তু উপায় কি এই ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার? দেখে নেওয়া যাক সেই উপায় গুলো যা আপনি ফলো করলে মৃত্যু ভয় বিদায় নেবেঃ

১. ভালো কিছু কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন

ব্যস্ততা সব রোগের ওষুধ। ভালো কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকলে দেখবেন প্রত্যহ যে শরীরে টুকটাক ব্যথা করে, সেইসব ব্যথার কথা আপনি ভুলে গেছেন।

তবে অবশ্যই লক্ষ্য রাখুন যে কাজে আপনি ব্যস্ত সেই কাজ যেন সমাজের জন্য হিতকর হয়।

আসলে বয়স্ক মানুষদের মৃত্যু ভয় বেশী হয়। কারন টা খুবই স্বাভাবিক। তারা জানে যে তারা সমাজের কাছে পুরানো হয়ে গেছে, আর নতুনদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য তাদের জায়গা ছেড়ে দিতে হবে।

আর এইসব চিন্তা তখন ই আসবে যখন আপনার কাছে কোন কাজ থাকবে না। যদি আপনার শরীরে সামর্থ্য থাকে, তাহলে অবশ্যই কিছু না কিছু কাজ করুন।

অনেক কাজ আছে যার জন্য শারীরিক পরিশ্রম লাগে না। সেইসব কাজ বেছে নিন।

২. কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ঈশ্বরের সামনে মুখ করে বসে থাকুন

যদি আপনি মন্দিরে বা মসজিদে বা গির্জায় যেতে না পারেন, বাড়ি টাকেই মন্দির/ মসজিদ/ গির্জা বানিয়ে দিন। আপনার পছন্দ মত করে সাজিয়ে নিন। সেই রুমে ঢুকলেই আপনি ভালো চিন্তা করবেন এইরকম প্রতিজ্ঞা করুন নিজেই নিজের কাছে।

আপনি কিছু ঈশ্বরের ফটো দিয়ে ঘর টাকে সাজিয়ে তুলতে পারেন। প্রত্যহ সকাল অ সন্ধ্যে বেলাতে ১০-১৫ মিনিটের জন্য ঈশ্বরের সামনে বসুন।

৩. ভাবনা চিন্তা বদলে ফেলুন

বাজে কাজ বা ঘৃণ্য কাজ জাতে মানুষ না করে, তাই তো ঈশ্বর/ আল্লহা মৃত্যু ভয় এর সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আপনি তো সেই দলে পড়েন না, তাহলে আপনি কেন ভয় পাবেন?

মৃত্যু হলে হবে আর টা যেন সুখকর হয় এই রকম আশা রেখেই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন। মৃত্যু তো ঈশ্বরের সাথে মিলিত হওয়ার উপায় মাত্র। জন্মের মাধ্যমে ঈশ্বর লোক থেকে মর্ত্য লোকে এসেছিলেন। আর মৃত্যুর মাধ্যমে মর্ত্য লোক থেকে আবার ঈশ্বর লোকে যাবেন।

এতে তো আনন্দ হওয়ার কথা। বরং সময় নষ্ট না করে, যতটা ভালো কাজ করা যায় তার চেষ্টা করুন। সময় বড্ড কম। কারন ঈশ্বর লোকে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে আপনাকে হিসেব দিতে হবে – কতটা সময় আপনি কাজে লাগিয়েছেন, আর কতটা সময় আপনি ফাঁকি দিয়েছেন।

৪. মোটিভেশনাল ব্লগ পড়ুন

ভাবনা চিন্তা যদি বদলাতে না পারেন, তাহলে মোটিভেশনাল ব্লগ পড়ুন। একদিন, দুদিন না, প্রত্যহ ১০-১৫ মিনিটের জন্য মোটিভেশনাল ব্লগ বা বই পড়ুন।

৫. ভালো খাবার খান

আমাদের খাবারেই তো আমাদের শরীর আর মনের ইনপুট। আপনি ভালো খাবার খেলে সেইসব খাবার ভালো শক্তি দেবে আপনার মনে ও শরীরে। আর জাঙ্ক ফুড, অত্যধিক মশালা যুক্ত খাবার, অত্যধিক আমিষ আহার আপনার শরীর ও মনে নেগেটিভ শক্তির জন্ম দেবে।

তাই ভেবে চিন্তে খাবার খান। আর খাবার আগে খাবার কে কৃতজ্ঞতা জানান।

৬. ঘুমোতে যাওয়ার সময় আর ঘুম থেকে ওঠার সময় ফিক্স করুন

আপনার যেমন বয়সই হোক না কেন, এই দুটো সময় আবশ্যই স্থির করুন। চেষ্টা করুন রাত্রি ১০ টার আগেই বিছানাতে যাওয়ার। সকাল ৬ টার আগেই ঘুম থেকে ওঠার। সূর্যের প্রথম কিরনে নিজেকে সিক্ত করুন। আর এইভাবে পজিটিভ শক্তির অধিকারী হয়ে উঠুন।

৭। মেডিটেশন করুন

যদি পারেন তো মেডিটেশন করুন আর যদি তা না পারেন, তাহলে চোখ খুলে ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকুন। দেখুন না কতক্ষণ থাকতে পারেন চোখের পলক না ফেলে। এইভাবে কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকলে, কিছুতেই বাজে চিন্তা আসবে না।

আর ধীরে ধীরে আপনার মন থেকে মৃত্যু ভয় ও চলে যাবে।

এই ৭ টি উপায়ই পারে আপনার মৃত্যু ভয় দূর করতে। এর জন্য কোন ওষুধের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা আর সাথে এই ৭ টি উপায় ফলো করুন। আমাদের বেশীরভাগ সমস্যার ওষুধ আমাদের মধ্যেই নিহিত থাকে। আপনার কাজ শুধু সেই ওষুধ গুলোকে খুঁজে বার করা।

যে কোন ভয়ই আমাদেরকে উদ্বেগ এর দিকে ঠেলে দেয়। মৃত্যু কে ভালো চোখে দেখুন। জন্ম যদি ভালো হয়, মৃত্যু তবে নয় কেন। জন্ম আর মৃত্যু দুইই তো একই কয়েন এর এই পিঠ আর অই পিঠ। তাই আপনি যদি জন্ম কে ভালবাসেন, তাহলে মৃত্যু কেও ভালবাসুন। তবে প্রাকৃতিক মৃত্যু কে ভালবাসুন। যাকে ভালবাসেন, তাকে ভয় কিসের? তাই আজ এই মুহূর্ত থেকে মৃত্যু ভয় কে বিদায় দিন। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সকলকে ভালো রাখুন। চলুন সবাই মিলে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি যার প্রতিটি কোনা ভরে উঠবে ঈশ্বরের আশীর্বাদে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট