রচনা লেখার নিয়ম গুলো কি কি?

রচনা লেখার নিয়ম গুলো যদি জানা থাকে, রচনা লেখা খুবই সহজ। তবে হ্যাঁ, যে টপিক নিয়ে রচনা লিখতে চান, সেই টপিক সম্পর্কে বেশ কিছুটা জ্ঞান থাকা দরকার, বা সেই টপিক সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা দরকার। এরপর অনেকেই আছেন যারা টপিক সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা সত্ত্বেও গুছিয়ে লিখতে পারেন না। আপনার লেখা রচনা টি পড়ে আপনার টিচার যেন খুশী হন বা উনি পড়া টা চালিয়ে যেতে যাতে আগ্রহী হন, সেই ব্যাপারেও আপনার খেয়াল রাখা দরকার।

কোন কিছু সৃষ্টি করাকে রচনা বলে। তবে এখানে রচনা বলতে প্রবন্ধ রচনার কথাই বোঝায়। বাংলায় রচনা মানেই তথ্য প্রদানের সাথে সাথে ভাষার মাধুর্যও থাকা দরকার। এইসব কিছু নিয়েই আমি এই টপিকে আলোচনা করবো। প্রচুর ছাত্রছাত্রী আছেন যারা রচনার নাম শুনলেই ঘাবড়ে যান।

টপিক নিয়ে তথ্য হয়তো আপনি জানেন, কিন্তু তাও কি ঘাবড়ে যাচ্ছেন? ভাবছেন –এই তথ্যগুলো লিখলে তো এক পাতাও হবে না, আর রচনা মানেই তো অনেকটাই দীর্ঘ হতে হবে। কম তথ্য অথচ নিখুঁত তথ্য –যত টুকু দরকার ঠিক তত টুকুই তথ্য দিয়ে সাথে আনুসাঙ্গিক কিছু দিয়ে ভাষার মাধুর্য বজায় রেখে কিভাবে রচনা টি লিখবেন দেখে নিন। শুরু করা যাক রচনা লেখার নিয়ম গুলো।

রচনা লিখার নিয়ম

পরিকাঠামো ঠিক করুন

যেমন বাড়ী তৈরী করার আগে একটা লেআউট তৈরী করে নিতে হয়, ঠিক সেইভাবে একটা ছক বা পরিকাঠামো তৈরী করে নেবেন। অর্থাৎ ভুমিকাতে কি লিখবেন, ভুমিকার পরে কি হেডলাইন দেবেন, সেইসব কিছু এক ঝলকে ভেবে নিন। পরীক্ষা হলে নতুন করে রচনা এলে এক ঝলকে পরিকাঠামো করা সম্ভব নয়, তাই পরীক্ষার আগে বিভিন্ন টাইপের রচনার পরিকাঠামো বানাতে অভ্যেস করুন।

পরিকাঠামো হল বাড়ীর বাউন্ডারি দেওয়ালগুলো। তাই পরিকাঠামো যেন সুন্দর হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেবেন। অনেক শিক্ষক আছেন যাদের প্রচুর খাতা খুব কম সময়ে দেখতে হয়; তাই তাঁরা পরিকাঠামো দেখে, আর প্রতিটি হেডলাইনের ১-২ লাইন পড়েই বুঝে যান, যে ওই ছাত্র বা ছাত্রীটি কতোটা নাম্বার পাওয়ার যোগ্য। বাড়ীর যেমন বাহিরের দেওয়াল আর তার রঙ দেখেই আন্দাজ করা যায়, বাড়ীর ভেতর টা কেমন হবে, ঠিক তেমন ভাবেই পরিকাঠামো দেখেই বোঝা যায় রচনা টি কেমন হবে।  

কিভাবে রচনার ভূমিকা লিখবেন?

ভূমিকা হল বাড়ীর দরজার মতো। তাই আপনি কি নিয়ে রচনা লিখতে চলেছেন তা পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তুলবেন ভূমিকা তে। বাড়ীতে অতিথি এলে, একটু ঢোকা মাত্রই অতিথি যেমন বাড়ীর সব কিছু দেখতে পাই না, কিন্তু বুঝে যায় কতগুলো রুম আছে, বারান্দা কোনদিকে, ইত্যাদি; ঠিক সেইরকম ভাবে আপনিও ভূমিকা লিখবেন।

এমনভাবে ভূমিকা লিখুন, যেন পাঠক বুঝতে পারেন আপনি কিসের ওপর রচনা লিখতে চলেছেন। কিন্তু সেই সব ব্যাপারে বেশী তথ্য ভূমিকা তে দেবেন না। কিন্তু পাঠকের মনে আরও ভেতরে প্রবেশ করার একটা কৌতূহল জন্মাবে, মানে পাঠক আপনার রচনা পড়তে আগ্রহী হবেন। পাঠক এর মনে হবে- এর পরে কি আছে, আরও একটু পড়া যাক।  

ভূমিকা এবং উপসংহারের মাঝে কি লিখবেন?

অতিথি যখন মেন দরজা দিয়ে ঢুকে একটা রুমে প্রবেশ করে যায়, তখন প্রচুর প্রশ্ন করতে থাকে। এই দেওয়ালে কোন কোম্পানির রঙ দিয়েছেন, এই ওয়াড়ড্রোব টা বানাতে কতো খরচ হয়েছে, বুক সেলফ টা কাকে দিয়ে বানিয়েছেন- এইসব যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর অতিথি পেয়ে থাকেন।

আপনিও ঠিক একই রকম ভাবে ভূমিকা এবং উপসংহারের মাঝে শুধু তথ্য দেবেন। আপনার শিক্ষক কিম্বা পাঠক যেন প্রচুর তথ্য পেয়ে থাকেন।

ভূমিকা এবং উপসংহারের মাঝে কি কি হেড লাইন দেবেন?

ভূমিকা এবং উপসংহারের মাঝে  কি কি লিখবেন তা নির্ভর করে আপনি কি টাইপের রচনা লিখছেন তার ওপর।

যদি কোন মহাপুরুষের জীবনী নিয়ে রচনা লিখেন, তাহলে হেডলাইন গুলো হবে এরকমঃ

শৈশববেলা, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, পুরষ্কার প্রাপ্তি, অবসর জীবন (মানে After Retirement)। আর তারপরে বিশেষ কিছু তথ্য দেবেন যদি দেখেন যে ওই মহাপুরুষের মধ্যে তা থেকে থাকে- যেমন ধরুন – আধ্যাত্মিকতা বা আধ্যাত্মিক জীবন।

যদি এমন কিছু নিয়ে রচনা লিখতে হয় যেখানে প্রকৃতির অবদান আছে, যেমন ধরুন যদি “একটি গাছ একটি প্রান” নিয়ে রচনা লিখতে হয়, তাহলে এইভাবে হেডলাইন দেবেনঃ

ভূমিকা, জীবনে গাছপালার গুরুত্ব, প্রাণীকুল রক্ষায় গাছপালার ভূমিকা, বৃক্ষ রোপণের প্রয়োজনীয়তা, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে বৃক্ষ রোপণ অভিযান, উপসংহার।

যদি কোন কিছুর আত্মকথা লিখতে হয় যেমন ধরুন যদি “একটি নদীর আত্মকথা” নিয়ে রচনা লিখতে হয়, তাহলে এইভাবে হেডলাইন দেবেনঃ

ভূমিকা, আত্মকথা কি, আমার জন্ম, আমার বিস্তার, প্রাণীকুল এর সাথে আমার সম্পর্ক, আমার প্রয়োজনীয়তা, আমার সুখদুঃখের ইতিহাস, উপসংহার।

যদি তোমার প্রিয় কিছুর ব্যাপারে লিখতে হয় যেমন “আমার প্রিয় ঋতু” নিয়ে যদি রচনা লিখতে হয়, তাহলে এইভাবে হেডলাইন দেবেনঃ

ভূমিকা, আমার প্রিয় ঋতু কি এবং কেন, শরৎকালের বৈশিষ্ট্য, শরতের আগমন, শরতে অপরূপ প্রকৃতি, শরতের উৎসব, শরতের প্রয়োজনীয়তা, উপসংহার।

যদি কোন কিছুর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে হয় যেমন ধরুন “একটি ঝড়ের রাতের অভিজ্ঞতা”, তাহলে যে হেডলাইনগুলো দেবেন তা হলঃ

ভূমিকা, ঝড়ের পূর্বাভাস, সতর্কতা, ঝড় আসার প্রাক্কালে, ঝড়ের ভয়ঙ্কর রূপ, ঝড়ের তাণ্ডবলীলা, ক্ষয়ক্ষতি, নিদ্রাহীন রাত, ঝড় শেষ হয়ে যাওয়ার পরে, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার অবদান, উপসংহার।

কিভাবে উপসংহার লিখবেন?

অতিথি দেখবেন সব কিছু দেখার পর জিগ্যেস করেন- আর টয়লেট কোনদিকে। জানেন তো- একটা বাড়ীর টয়লেট দেখে বাড়ীর মানুষ গুলো কতখানি পরিষ্কার থাকেন, তা বোঝা যায়। ঠিক তেমনি উপসংহার এ কি লিখেছেন, তা থেকে আপনার জ্ঞান বোঝা যায়।

আবার এটাও শুনেছেন যে – শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। ঠিক তেমনি ভাবেই, শিক্ষকরাও কিন্তু সময় কম থাকলে পরিকাঠামো দেখেন, আর ভূমিকা এবং উপসংহার পড়েই বুঝে যাবেন আপনার ওয়েটেজ কতখানি।

তাই কখনোই তাড়াহুড়ো করে, যেমন তেমন করে উপসংহার লিখে রচনাটি শেষ করে দেবেন না যেন। উপসংহার হবে –আপনি এতক্ষণ যা কিছু লিখলেন তার সামারি।

কিভাবে রচনা টি শেষ করবেন?

উপসংহার কিভাবে লিখবেন তা তো আগেই বলেছি। কিন্তু উপসংহারের শেষ দুটো লাইন কিভাবে লিখবেন সেটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন অতিথি বাড়ীর অনেক টা ভেতরে মানে হল ঘর ছাড়িয়ে রুমের শেষ দিকে পৌঁছানোর সময় বুঝতে পারেন যে এখানের দরজা টি নিশ্চয় বেলকনির দরজা, ঠিক সেই রকম ভাবেই শেষ দুটো লাইন শেষ না হতে হতেই যেন বোঝা যায় যে আপনি রচনা টি শেষ করতে চলেছেন। ওই দুটো লাইন যেন রচনা টিকে পরিপূর্ণতার রূপ দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

ভাষার দিকে গুরুত্ব দিন

খুব জটিল ভাষা লিখলেই যে তার গুরুত্ব বাড়বে – এমন ধারনা একেবারেই ভুল। সহজ ভাষাও পৃথিবীর সবচে জটিল অলঙ্কার পূর্ণ ভাষাকে হারিয়ে দিতে পারে, খুব সহজেই। তাই পুরো রচনাটা সহজ ভাষায় লিখুন। এমন শব্দ লিখবেন না যার অর্থ আপনি জানেন না। কেননা সেক্ষেত্রে ঠিক জায়গায় সেই শব্দ টি প্রয়োগ করার ব্যাপারেও আপনি ভুল করতে পারেন।

অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট

এছাড়া নীচে উল্লিখিত পয়েন্ট গুলোর দিকেও বিশেষ নজর দিনঃ

১। রচনা লিখার পর একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিন সব বানান ঠিক আছে কিনা

২। সাধু ভাষা, চলিত ভাষা মিশিয়ে ফেলবেন না, যে কোন একটা ভাষা তে লিখুন।

৩। যে টপিকের ওপর রচনা লিখবেন, তার ওপর জ্ঞান থাকাটা খুবই জরুরী।

৪। আপনার জানা জ্ঞান কে খুব সুন্দর ভাবে পয়েন্ট অনুসারে সাজিয়ে লিখবেন। কোন তথ্য কোন হেডলাইনে রাখা যাবে তা আগে ঠিক করে নিন।

৫। কিছু বিখ্যাত কবিদের কবিতার লাইন যদি প্রাসঙ্গিক মনে হয়, তাহলে সেইসব লাইন বা কোন প্রাসঙ্গিক কোটেশন প্রতিটি হেডলাইনেই দিতে পারেন। তবে প্রাসঙ্গিকতা বিচার করে দেবেন।

৬। অপ্রাসঙ্গিক কিছুই লিখবেন না। তথ্য ছাড়া শুধু নানান রকম গল্প লিখে রচনা কে বিনা কারনে দীর্ঘায়িতো করবেন না। 

উপরে উল্লিখিত সমস্ত পয়েন্ট গুলো ফলো করে চললে, আপনার রচনা ১০০% মার্কস পেতে বাধ্য। সবসময় রচনার সাইয দেখে মার্কস নির্ধারিত হয় না। উল্টোপাল্টা তথ্য দিয়ে আপনি যদি ৭-৮ পাতা রচনা লিখেন, এতে আপনি অযথা সময় নষ্ট করবেন।

যদি রচনা দীর্ঘায়িতো করতে হয়, তাহলে প্রচুর তথ্য জানা টা খুব ই জরুরী। আশা করি, আমি রচনা লিখার সব নিয়ম গুলো তুলে ধরতে পেরেছি যা আপনাদের রচনা লিখতে সাহায্য করবে। প্রচুর তথ্য যদি হাতে থাকে, তাহলে এই নিয়মগুলো জানার পরে আশা করি আপনারা গুছিয়ে খুব ভালো পরিকাঠামোতে রচনা টিকে সাজিয়ে তুলতে পারবেন।

আপনি যদি কোন স্পেশাল রচনা খুঁজে চলেছেন, তাহলে আমাকে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। আমি অবশ্যই সেই রচনাটিও তুলে ধরবো এখানে। রচনা লেখার নিয়ম গুলি আশা করি আপনাদের ভালো লেগেছে। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট