কিভাবে স্বপ্নকে লক্ষ্যে পরিনত করে স্বপ্ন পূরণ করা যায়?

কে না চায় স্বপ্ন পূরণ করতে? স্বপ্ন পূরণ হলেই তো জীবনে সফলতার স্বাদ পাওয়া যায়।

আকাশ কুসুম কল্পনাগুলো না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্নগুলো শুধু যদি সত্যি হতো, তাহলে আর কোন সমস্যাই থাকতো না।

মনের রাজ্যে যত ইচ্ছে স্বপ্ন বুনতাম আর সবরকম সুখ উপভোগ করতাম। আমরা সবাই রাজা হতাম। সবাই রাজা হলে রাজা হওয়ার আনন্দ কোথায়?

সবাই মনের সব ইচ্ছে পূরণ করতে পারতো, যদি সবার মধ্যে একই গুনগুলো থাকতো। কিন্তু এমনটা হয় আর কোথায়?

স্বপ্ন তো সেটা নয় যা আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখি। যে স্বপ্ন আমাদের ঘুমোতে দেয় না, আমাদের মধ্যে একটা অস্বস্তিবোধ তৈরি করে; আমরা মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা, চঞ্চলতা অনুভব করি; আর তা পূরণের জন্য আমরা কোন কিছুকে পরোয়া না করে শুধু পরিশ্রম করে যায়- এখানে সেই স্বপ্নের কথাই বলবো।

স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগে আমাদের মধ্যে সেইসব কি কি গুন / অভ্যেস তৈরি করা দরকার দেখে নেওয়া যাকঃ

১। ত্যাগ স্বীকার

উপযুক্ত সুবিধে পাচ্ছেন না? আপনি কি ভাবছেন আপনার যদি তাদের মতো সুবিধে থাকতো আপনিও আপনার স্বপ্ন পূরণ করতে পারতেন?

আপনাকে কি অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়? আপনি কি সেই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে পারছেন না? তাহলে সেই কষ্টকে সাথে নিয়েই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। কিছু পেতে গেলে এইটুকু ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হবে।

২। আত্মবিশ্বাস

Optimism is the faith that leads to achievement. Nothing can be done without hope and confidence

Helen Keller

আত্মবিশ্বাস হল জীবনে এগিয়ে যাওয়ার একটা সিঁড়ি। আপনি যদি নিজেই নিজেকে বিশ্বাস না করেন; এই গোটা দুনিয়া আপনাকে বিশ্বাস করবে না।

নিজের গুনগুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন। কিছু স্পেশাল গুন তো আপনার মধ্যে অবশ্যই আছে।

নিজেকে দিয়ে শুরু করুন, দেখবেন গোটা পৃথিবী আপনাকে অনুসরণ করছে।

৩। কঠোর পরিশ্রম

সৃষ্টিকর্তা তাদেরেই সাহায্য করেন যারা কঠোর পরিশ্রম করেন

ডঃ আব্দুল কালাম

স্বপ্ন পূরণ কখনই সম্ভব নয়, যদি আপনি পরিশ্রম না করেন।

আপনি অলস মস্তিষ্কে যত মহান স্বপ্নই রচনা করুন না কেন; সেই স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না।

আপনার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য এখন এই মুহূর্তে পরিশ্রমের মধ্যে ডুবে পড়ুন।

কাজের কারনে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি না, আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি দুশ্চিন্তা এবং হতাশার কারনে।

ডঃ আব্দুল কালাম

আপনি যদি ভালবেসে মন থেকে খুব পরিশ্রম করেন, ক্লান্তি আপনাকে কখনোই ডিস্টার্ব করবে না।

পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই
কঠোর পরিশ্রম

৪। ধৈর্য

আজ এই মুহূর্তে একটা স্বপ্ন দেখে কালকের মধ্যেই তা সফল হওয়ার আশা করবেন না।

একটু ধৈর্য ধরুন। আপনার কাজে নিষ্ঠা বাড়ান। আপনি আগে আপনার কাজে অভিজ্ঞ হন।

তাড়াহুড়ো করবেন না। তাড়াহুড়ো করে কাজের quality খারাপ করবেন না।

তাড়াহুড়ো করে সফলতা আনতে গেলে একদিন দেখবেন – আপনি যে দুটো সিঁড়ি উঠেছিলেন, এখন আরও তিনটে সিঁড়ি নেমে গেছেন।  

হাল ছাড়বেন না
শরীর না কাজ করলেও মন দুর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে- এমনই ধৈর্য রাখো।

৫। ঝুঁকি

জীবনে কঠিন বাধাসমূহ আসে তোমাকে ধ্বংস করতে নয়, বরং আসে তোমার ভেতরে লুকানো অফুরন্ত শক্তি ও সম্ভাবনাকে অনুধাবন করাতে যে –বাধাসমূহকে দেখাও যে তুমিও কম কঠিন নও।

ডঃ আব্দুল কালাম।

স্বপ্ন পূরণ এর রাস্তা গুলোতে bumper তো থাকবেই। আপনি যখন journey করেন, তখনো তো বাম্পার থাকে।

তাহলে কি বাম্পার এর ভয়ে সেই journey আপনি বন্ধ করে দেন? নিশ্চয়, করেন না। থাক না ঝুঁকি, এগিয়ে যান সামনের দিকে।    

৬। অজুহাত না দেওয়া

অন্য লোকের ওপর বা পরিস্থিতির ওপর দোষারোপ না করে, স্বপ্ন পূরণের জন্য লক্ষ্যের সিঁড়িতে চেপে পড়ুন।

অজুহাত দেওয়া মানেই তো আপনার স্বপ্নের মধ্যে দৃঢ়তা নেই। তাই এই মুহূর্ত থেকে অজুহাত দেওয়া বন্ধ করুন।

৭। অভিজ্ঞ ব্যাক্তির পরামর্শ

যদি তুমি এমন কাওকে খোঁজো যে তোমার জীবন পরিবর্তন করতে পারবে, তাহলে গিয়ে একবার আয়নার সামনে দাঁড়াও।

ডঃ আব্দুল কালাম

আপনিই তো আপনাকে সবচে বেশী ভালোভাবে জানেন। তাহলে অন্যের থেকে পরামর্শ নেবেন কেন? তবে হ্যাঁ, অভিজ্ঞ ব্যাক্তির জীবনী পড়ুন। সেখান থেকে কিছু শিখুন।

৮। পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিন – স্বপ্ন পূরণ হবেই

আপনি উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছেন না তো? কিন্তু কে দেবে বলুন তো এই পরিবেশ? সবাই ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত।

আর সেই কারনে আপনিই আপনাকে দেবেন এই পরিবেশ। পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আপনাকেই খুঁজে দেখতে হবে কি রকম পরিবেশে আপনি সারা দিন রাত কাজ করলেও, ক্লান্তি আপনাকে গ্রাস করবে না।

৯। স্বপ্ন পূরণ করতে হলে ব্যর্থতার বই পড়ুন

সফলতার গল্প পড় না, ব্যর্থতার গল্প পড়। সফলতার গল্প তোমাকে শুধু উপদেশ দেবে কিন্তু ব্যর্থতার গল্প তোমাকে সাফল্যের পথ দেখাবে, সফলতার ধারনা দেবে।

ডঃ আব্দুল কালাম

বই পড়ে আপনি আপনার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বাড়াতে পারবেন। স্বপ্ন পূরণের জন্য অভিজ্ঞতা খুবই দরকার।

সাফল্যের গল্পের চেয়ে ব্যর্থতা এর গল্পে আপনি বেশী অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন।

১০। বাস্তববাদী

স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে হলে অলীক কল্পনা করবেন না। স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে বাস্তবের সিঁড়িতে উঠে স্বপ্নটাকে কল্পনা করুন।

স্বপ্ন পূরণ করার প্রথম স্টেপই আপনি জানতে পারবেন –আপনি কোন কাজটা ভালোবাসেন আর কোনটা বাসেন না। যে কাজ আপনি ভালোই বাসেন না , আর সেই কাজ এ নিযুক্ত থেকে বড় হওয়ার স্বপ্ন কখনো দেখবেন না।

এবার চলুন বাস্তবের রাজ্যে বিচরণ করা যাক। যা হবার নয়, তা নিয়ে ভেবে কি লাভ? তবে হ্যাঁ, স্বপ্নগুলো সত্যি করা তো যেতেই পারে। বসে বসে অলস মস্তিষ্কে স্বপ্ন বুনলে তা সত্যি হবে না ঠিকই। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম এর সাথে আর কি কি করলে স্বপ্নগুলো সত্যি হবে –তাই দেখে নেওয়া যাক।

ওপরের অভ্যেসগুলো যদি আপনার মধ্যে থেকে থাকে মাত্র ৫টি স্টেপস এর মাধ্যমে স্বপ্নগুলো কিভাবে সত্যি করতে পারেন দেখে নিন-

১। স্বপ্ন পূরণ করতে নিজেকে পর্যালোচনা করুন(Analyse yourself)

আমরা অনেকেই নিজেকেই চিনি না ভালো করে। নিজেকে না জানলে, কি করে স্বপ্নগুলকে জানবেন? আর স্বপ্নগুলো সম্বন্ধে না জানলে তা পূরণ হবে কি করে? সেইজন্যই তো আগে ভালো করে আপনার স্বপ্নগুলো সম্বন্ধে জানুন। স্বপ্নগুলো জানা মানেই তো আপনি বড় হয়ে কি হবেন, কোন কাজটা করলে আপনি খুশী হবেন- এইসব সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা।

তাই নিজেকে পর্যালোচনা করুন। কোন কাজগুলো আপনি ভালোবাসেন, আর কোন কাজগুলোতে আপনি রেগে যান, বিরক্তি আসে – সেই সব সম্বন্ধে জানুন। কোন কাজগুলোতে আপনি মজে থাকেন, মানে – আপনি বুঝতেই পারেন না যে কখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে, আপনি এতোটাই কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন যে দিন-রাতের পার্থক্যই করতে পারেন না সেইসব কাজগুলোর একটা লিস্ট বানিয়ে ফেলুন।

২। তথ্য সংগ্রহ (Data Collect)

আপনার ওই পছন্দের লিস্ট থেকে সবচে পছন্দের কাজটা যা আপনি সবার প্রথমে লিখেছেন, সেই কাজে নিশ্চয় বর্তমানে কিছু লোক নিযুক্ত থেকে রোজগার করে থাকে। আপনি সেইসব লোকের খোঁজ করুন।

আপনার পরিচিতি এর মধ্যেও কিছু লোক পাবেন, যারা আপনার মতোই ওই কাজকে পছন্দ করেন বা বাধ্য হয়ে ওইসব কাজ করেন। আপনি তাদের খোঁজ করুন। তারা কি ওইসব কাজে ভালোই সুখী। শুধু সুখী না, কিছু অসুখী লোকের থেকেও কিছু তথ্য সংগ্রহ করুন যেমন ধরুন তারা কেন সুখী নয়, তারা কি ধরনের সমস্যার মধ্যে আছে।

তারপর দেখুন সেই সমস্যাগুলো কি আপনার  ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মানে আপনি কি সেই সমস্যাগুলোর মধ্যে পড়লে কাটিয়ে উঠতে পারবেন নাকি পারবেন না? যদি না পারেন তাহলে আবার প্রথম স্টেপ এ ফিরে গিয়ে আপনার পছন্দের কাজের লিস্ট টা দেখবেন।   

৩। তথ্য বিচার ( Data analysis)

যেসব তথ্য আপনি সংগ্রহ করলেন, এবার সেইগুলো নিয়ে বিচার করে দেখুন যে আপনি যে কাজটাতে নিযুক্ত হবেন ভেবেছিলেন, সেই কাজ টা করতে পারবেন কিনা। ওই কাজে কোন সমস্যা থাকলে সেই সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে পারবেন কিনা আর যদি সমাধান করতে না পারেন তাহলে ওই সমস্যাগুলোকে অবহেলা করে জীবনে এগিয়ে যেতে পারবেন কিনা।

যদি আপনি কাজটাকে খুবই ভালোবাসেন, কাজ টা আপনি যতই দীর্ঘ সময় ধরে করুন না কেন, ক্লান্তি আপনাকে গ্রাস করতে পারে না। তাহলে আপনার সেই ভালবাসায় তার জোর দিয়ে সব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। আপনার ওই কাজের প্রতি ভালবাসা কতখানি মজবুত, তা চেক করুন।

৪। স্বপ্ন পূরণ এর জন্য স্বপ্ন দেখুন (Dream)

ওপরের তিনটি স্টেপস নিখুঁত ভাবে মেনে চললে, আপনি বুঝে যাবেন যে আপনার কোন কাজ টা নিয়ে স্বপ্ন দেখা উচিত।

স্বপ্ন দেখা হল একটা ইনপুট আর স্বপ্ন পূরণ হল একটা আউট পুট। যে কোন আউট পুট পেতে হলে, ইনপুটের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া উচিৎ।

এই স্টেপ এ আপনি স্বপ্ন দেখা শুরু করুন। মানে আপনি গভীরভাবে ভাবুন যে আপনি ওই কাজে নিযুক্ত সফল ব্যক্তিদের মতো একজন হবেন।

কিন্তু স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বর্তমান কে ভুলে যাবেন না যেন।

আর লক্ষ্য রাখবেন স্বপ্ন যেন ছোট না হয়। স্বপ্ন ছোট মানে তো নিজেকে ছোট চোখে দেখা।

স্বপ্ন যেন ছোট না হয়
বড় স্বপ্ন দেখুন

৫। স্বপ্ন পূরণ করতে কল্পনা করুন ( Visualization)

এই লাস্ট স্টেপ এ আপনি কল্পনা করুন যে আপনি যা যা চেয়েছিলেন, তাই তাই পেয়ে গেছেন।

যেমন ধরুন- আপনি যদি স্বপ্ন দেখে থাকেন যে আপনি ডাক্তার হবেন, তাহলে কল্পনা করুন যে আপনি ডাক্তার হয়ে গেছেন; আপনি খুবই ব্যস্ত, প্রত্যেকদিন প্রচুর রোগীর চিকিৎসা করেন। রোগীরা আপনাকে পেয়ে খুব খুশী।

আপনি চিকিৎসাব্যবস্থায় কিভাবে উন্নতি করবেন, সেইসব ভেবে higher study করছেন। প্রচুর পরিশ্রম হচ্ছে আপনার কিন্তু তাও আপনি কাজের মধ্যে মজা পাচ্ছেন।

এইসবকিছু, মনের মধ্যে গভীরভাবে ভাবুন। এই চিন্তা ছাড়া কোন দ্বিতীয় চিন্তা যেন মাথায় না আসে।

এইসব চিন্তার মাঝে হঠাৎ করে যদি আপনি অন্য কিছু যেমন আপনি একজন বড় শিক্ষক এর কল্পনা করে বসেন, তাহলেই স্বপ্নের দৃঢ়তা কমে যাবে।  

স্বপ্নগুলো ভিজুইলাইজ করুন
ভিজুইলাইজেশেন

আপনি যদি ওই ৫ টি স্টেপস অনুসরণ করেন কিন্তু পরিশ্রম না করেন, তাহলে কখনোই সফল হবেন না।

স্বপ্ন পূরণ এর জন্য ওপরের ৫ টি স্টেপস অনুসরণ করার সাথে সাথে প্রথমেই উল্লেখ করা ১০ টি অভ্যেস এ রপ্ত হতে হবে। 

এই অভ্যেসগুলো রপ্ত করার পর আপনি দেখবেন আপনার মধ্যে এক অস্থিরতা যা আপনাকে ঘুমোতে দেবে না, স্বপ্নটা আপনাকে তাড়া করবে আর বলতে থাকবে -“ওঠো, বড় তোমাকে হতেই হবে, কাজ করো”।

যেদিন আপনি এই পরিস্থিতিতে পড়বেন, আপনি জানবেন যে আপনি ঠিক দিকে এগোচ্ছেন।

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

One thought on “কিভাবে স্বপ্নকে লক্ষ্যে পরিনত করে স্বপ্ন পূরণ করা যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট