বিবাহ বিচ্ছেদ – কারন, প্রতিকার, সুবিধা, অসুবিধা

বিবাহ বিচ্ছেদ

প্রযুক্তিবিদ্যা উন্নতির সাথে সাথে মানবিকতাবোধের ও কি উন্নতি হচ্ছে? নাকি মানুষের মনে সঙ্কীর্ণতা বাসা বেঁধে চোখ দুটোকে অন্ধকারে ছেয়ে দিয়েছে? মানুষ আজ মেশিন। মেশিনের যেমন নেই বিবেক, ঠিক তেমনি মানুষের মনেও বিবেকের বড়ই অভাব। নেগেটিভ শক্তি তো নেগেটিভ শক্তিকেই আকর্ষণ করে। যেমন ভাবনা তেমনি ঘটনা। বর্তমানে এই কঠিন করোনা পরিস্থিতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ বেশ মাথা চাড়া দিয়ে বসেছে।

স্বামীস্ত্রীর মতবিরোধ একটি বিশাল বড় ছোঁয়াচে রোগ। টিভি, মিডিয়া, নিউজ এ স্বামীস্ত্রীর কলহ নিয়ে এতো ঘটনা দেখায়, মানুষ তাতে উৎসাহিত হয়ে যায়। মানুষের মনে এখন এই রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায় –বিবাহ বিচ্ছেদ অর্থাৎ ডিভোর্স। টিভি সেরিএল গুলোতে তাই তো দেখায়। আর এও দেখায় যে ডিভোর্সের পরেও ছেলেটি বা মেয়েটি বেশ সুখে আছে। তাই তো মানুষ অশান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য  ডিভোর্স কেই শ্রেষ্ঠ আর সহজ সমাধান বলে মেনে নিয়েছে। 

অনেক অনেক বছর আগেও স্বামী স্ত্রীর মতবিরোধ রোগ টি বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তখন মানুষ না বিদেশের সংস্কৃতির গন্ধ পেয়েছিল, না নিজের পায়ে সব টুকু সামলানোর স্বাদ পেয়েছিল। একজন রাজা তো আরেকজন প্রজা- এই তো ছিল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। একজন হুকুম করতো, আরেকজন তা মান্য করতো। কিম্বা একজন ঘরে শাসন করতো, আরেকজন বাইরে শাসন করতো।

একই দেশে যদি দুজন রাজা থাকে, তাহলে কি হবে বলুন তো? রাজায় রাজায় আরো বেশী মতবিরোধ হবে। এর ফলেই তো কলহ বাঁধবে। কলহ যদি আটকাতে চান, তাহলে তারও উপায় আছে। আর এইসব কিছু আলোচনা করবো এই পোস্টে।

আপনিও কি স্বামীস্ত্রীর মধ্যে কলহ রোগ টি থেকে মুক্তি পেতে চান? আপনিও কি একটু শান্তির স্বাদ পেতে চান? আপনি কি ডিভোর্স ছাড়া অন্য কিভাবে এই রোগের চিকিৎসা করা যায় তাই ভাবছেন, তাহলে এই পোস্টেই আপনি সেই ওষুধ পেয়ে যাবেন।

বিবাহ বিচ্ছেদ কি, এর সীমানা এতো বিস্তারিত কেন হচ্ছে, একে আটকানোর উপায় কি, এর কি কোন সুবিধাও আছে-তাহলে সেই সুবিধাগুলো কি, এর অসুবিধেগুলোই বা কি কি –এই সব কিছু নিয়েই তো আলোচনা করবো এখানে।

বিবাহ বিচ্ছেদ -কারন প্রতিকার সুবিধা অসুবিধা

বিবাহ বিচ্ছেদ কি

একজন পুরুষ আরেকজন স্ত্রী একে অপরের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে এক নতুন পরিবারের জন্ম দেওয়া কেই বিবাহ বলে। এই দায়িত্ব নিতে যদি কেউ একজন অস্বীকার করে ওই পরিবারের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে,তাহলেই তাকে বিবাহ-বিচ্ছেদ বলে। ইংরেজিতে যাকে ডিভোর্স বলা হয়।

যে বিবাহ আইনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল, সেই বিবাহ বন্ধন থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে আইনের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে হয়।

বিবাহ বিচ্ছেদ এর সূচনা

প্রাচীনকালে বেশীরভাগ মেয়েদের শিক্ষা ছিল না। স্বামীর আদেশ শোনাই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান বলে মেনে নেওয়া হত। এর ফলে অনেক মেয়ে অত্যাচার সহ্য করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত।

সমাজ ভেবেছিল পুরুষের হাতে বাহিরের সব দায়িত্ত্ব, আর পরিবারের দেখাশুনোর দায়িত্ব দিলে নারী পুরুষ শিশু সকলেই ভাল থাকবে। ধীরে ধীরে দেখা গেল- পুরুষের অত্যাচারে নারী জর্জরিত। এ যেন শাসকের শাসন না, শাসকের শোষণ। ব্যতিক্রম যে ছিল না তা নয়। কিন্তু সমজের এক বৃহৎ অংশ এই কারনে অসুস্থ। সমাজ তখন এই সমস্যার জন্য নিজেকে অভিযোজিত করলো। নারীদের মধ্যে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা হল।

ছড়িয়ে পড়লো নারী শিক্ষা দিকে দিকে। নারীরাও তাদের ক্ষমতা দেখাতে উঠে পড়ে লাগল।  এক অত্যাচারিত নারী কে সমাজ বলেছিল- “এমন পুরুষ মানুষের কাছে থেকে জীবন নষ্ট করো না, বেরিয়ে যাও এই পরিবার থেকে। বাহিরে অনেক পরিবার তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। কিছু করো নিজের জন্য, সমাজের জন্য।“ সেদিন সমাজের ওই কথা ওই অত্যাচারিত মেয়েটির হৃদয়ে সাহসের বিশাল বিশাল ঢেউ জাগিয়েছিল। মেয়েটি সমাজের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বেরিয়ে এসেছিল ওই পরিবার থেকে।

চারিদিকে ছিঃ ছিঃ পড়ে গিয়েছিল। মেয়ে ছেলেদের এতো তেজ নাকি শোভা পায় না, মাঝ রাত্রে স্বামী –সন্তান কে ছেড়ে পালিয়ে যায়, এ তো সাক্ষাৎ ডাইনী। এইসব কিছু শুনে সমাজ খুব আঘাত পেয়েছিল। একা নীরবে খুব কেঁদেছিল। আর বলেছিল –“ হে নারী জাতি! যে পুরুষ তোমার সম্মান রক্ষা করতে জানে না, সেই পুরুষের সাথে নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে একসাথে থাকাটা মোটেও শোভা পায় না। আজ থেকে তুমি স্বাধীন। কিন্তু এই স্বাধীনতার অপমান করো না যেন। এই স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিয়ে ধরে যদি রাখতে না পারো, আমায় আবার কিছু সংস্করণ করতে হবে।“

অত্যাচারিত নারীদের জন্যই তৈরি হয়েছিল ডিভোর্স। কিন্তু পরে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় – কিছু নারী পুরুষের ভাল স্বভাব দেখে তার ওপর মানসিক অত্যাচার করা শুরু করে দেয়। এই মানসিক অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে কিছু পুরুষ স্ত্রীর মতো করে চলতে শুরু করে, আর নিজের বাবা মা এর দায়িত্ত্ব নিতে অস্বীকার করে। আর কিছু পুরুষ যাদের পুরুষত্বে আঘাত লাগে, তারা তাদের জেদ এ অটল থাকে কারন তারা জানে যে তারা সঠিক। এইসব পুরুষ বউ এর জন্য বাবা মা কে ছাড়তে পারবে না সাফ জানিয়ে দেয় স্ত্রীদের। আর ওইসব নারীরাই তখন ডিভোর্স এপ্লায় করে, পুরুষ আর শশুর-শাশুড়ি এর নামে বদনাম দিয়ে।

আদালত সবসময় মেয়েদের কে অসহায় ভেবে এসেছে। কিন্তু এই অভিযোজিত সমাজে অসহায় মানুষটির কোন লিঙ্গ নেই। স্ত্রী যেমন অসহায়, অত্যাচারিত হতে পারে, পুরুষও ঠিক তেমনি অসহায় ও অত্যাচারিত হতে পারে। আদালত সমাজের সাথে সাথে, নারী শিক্ষার উন্নতির সাথে সাথে নিজেকে আর অভিযোজিত করে তুলতে পারে নি এখনো।

পুরুষের ওপর যে নির্মম অমানসিক অত্যাচার চলে, তার খবর কে রাখে। পুরুষ ও কাঁদে। কিন্তু পুরুষ মানুষ কে তার প্রতি অত্যাচার দেখানোর জন্য চোখের মধ্যে অশ্রু দিতে ভুলে গিয়েছিলেন বিধাতা। প্রকৃতি ভেবেছিলেন- তার বোধ হয় দরকার পড়বে না। বেশীরভাগ সহজ ,সুন্দর পুরুষ মানুষের আজ স্যান্ডউইচ এর মতো করুন অবস্থা। বউ আর মা-বাবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। সমাজ হতবাক! সমাজ তো প্রকৃতির হাতে বাঁধা। প্রকৃতি সমাজ কে পথ না দেখালে সমাজ সেই একই জায়গায় পড়ে থাকবে।

এ যেন বছর বছর ধরে পুরুষেরা যে অত্যাচার চালিয়েছিল নারীদের ওপর, প্রকৃতি যেন তারই বদলা নিচ্ছে। প্রকৃতির হাতে যে দাঁড়িপাল্লা যার একদিকে পাপ, আরেকদিকে পুণ্য- প্রকৃতি যেন দাঁড়িপাল্লাকে ব্যাল্যান্স করাতে ব্যস্ত।

বিবাহ বিচ্ছেদের কারণগুলো কি কি

নানা মুনি নানা মত। ঠিক তেমনি, নানা পরিবারে নানা সমস্যা। নানান রকমের কম্বিনেশন, নানান রকমের সমস্যা। তারই মধ্যে যে সব কারন গুলো অতীতে কোন না কোন পরিবারে দেখা গেছে, সেগুলোই তুলে ধরা যাকঃ

দেখে নেওয়া যাক এই ডিভোর্সের কারন গুলো কি কি।

১। পরকীয়া

কে যে কখন কার প্রেমে পড়বে, কোন বয়সেই বা প্রেমে পড়বে –বলা খুবই মুশকিল। প্রেমের কোন বয়স নেই, স্থান নেই, সময় নেই। তবে এইসব প্রেমের কোন ভীতও নেই। কিন্তু প্রেমের ভীত নিয়ে অন্য কোন পর্বে আলোচনা করবো।

পরকীয়া এর কোন লিঙ্গও নেই। বাড়ীর পুরুষ মানুষ টিও ধীরে ধীরে তার অফিসের কলিগের সাথে প্রেমের ফাঁদে পড়তে পারে। কিংবা বাড়ীর স্ত্রীও অফিসে বা পাড়ায় ছোটবেলার বন্ধুর সাথে অনেক বছর পরে প্রেমে পড়তে পারে। পরকীয়া এর সীমানা বিশাল।

আর এই পরকীয়াই সংসারের দেওয়ালে ফাটল তৈরি করে।

২। পুরুষ-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল  

মন বড়ই বিচিত্র। পরকীয়া, প্রেম- এইসব কিছুর ওপরে যদি আপনি উঠতে পারেন তাহলে এই সম্পর্কিত কোন সমস্যাই আপনাকে বিচলিত করবে না। কিন্তু কজন পারে সেই গণ্ডী কাটিয়ে উঠতে?

মনের অমিল, একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় কলহ।

৩। আবেগি মন

যৌন ইচ্ছা গুলো ছেলেদের মধ্যে যেমন মেয়েদের চেয়ে কম বয়সে শুরু হয়, ঠিক তেমনি মেয়েদের চেয়ে কম বয়সেই এর তীব্রটা কমতে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়।

বিবাহের বেশ কয়েক বছর পরে, পুরুষ মানুষের মধ্যে নানান স্ট্রেস এর কারনে যৌন ইচ্ছা প্রচুর পরিমানে হ্রাস পায়। তবে যেসব পুরুষেরা স্ট্রেস ছাড়া বিন্দাস জীবন কাটাতে পারে তারা সেই যৌন ইচ্ছা গুলোকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।

আবার বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টোটা হয়ে থাকে। আর এখানেই হয় সংঘাত, যা সংসারে ভাঙ্গন ডেকে নিয়ে আসে।

৪। পুরুষের আধিপত্য

এ আবার নতুন কি? প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে পুরুষ শাসিত সমাজ। তবে নতুনত্ব অবশ্যই আছে। কি সেই নতুনত্ত্ব? আগেও ভাল পুরুষ ,খারাপ পুরুষ ছিল। এখনও তাই আছে। আগে স্ত্রী ছিল শোষিত, পুরুষ কে সে দেবতা রূপে পূজা করতো। কিন্তু এখন তা নেই।

এটাই তো স্বাভাবিক! পরিবর্তন সবসময় শোষিতদের মধ্যেই আসে। নারী এখন স্বাধীন। স্বাধীন এখন সে তার চিন্তাধারায়, স্বাধীন সে আর্থিকভাবে। তাহলে কেনই সে সহ্য করবে?

প্রাচীনকালে, শুধুই কি নারীরা শোষিত ছিল? হায় রে বিধাতা! যে পুরুষ অহংকারে শোষণ করতে উন্মত্ত ছিল, সেই পুরুষেই কন্যা সন্তানের বিবাহের সময়ে অন্য এক পুরুষের কাছে শোষিত হত। আজ পরিবর্তন সেখানেও।

যেখানে যেখানে শোষণ, ঠিক সেখানে সেখানে পরিবর্তন। আজ কন্যা সন্তানের পিতারাও স্বাধীন। কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে আজ পিতা মাতারা গর্ব বোধ করে।

পুরুষের অত্যাচার মান্ধাতার আমল থেকে চলে আসছে। তা বলে কি ভাল পুরুষ মানুষ ছিল না? অবশ্যই ছিল।

প্রাচীনকালে, পুরুষের আধিপত্য স্ত্রীদের কাছে নতুন কিছু ছিল না। তাই তখন ডিভোর্সের জন্ম হয় নি। পাশ্চাত্য দেশেই প্রথম ডিভোর্সের জন্ম হয়। তারপর ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে আমাদের দেশে। বর্তমানে তা গ্রামের মধ্যেও শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছে।

৫। স্ত্রীর স্বাধীনতা

স্ত্রী আজ স্বাধীন। কিন্তু এই স্বাধীনতা কি পুরুষ মেনে নিতে পারে না? যা হবে সমান, সমান। এটাও ঠিক। তাহলে কি ডিভোর্সের পিছনে প্রধান কারন পুরুষেরাই?

আজও অনেক পুরুষ মানুষ স্ত্রীকে সহ্য করতে পারে না যদি সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। সেই স্ত্রী ক্রমশ হাঁপিয়ে ওঠে সংসারে। শেষে বাধ্য হয় কঠোর স্টেপস নিতে।

৬। পুরুষের বাবা মা

মান্ধাতার আমল থেকে চলে আসছে স্ত্রী রা কম বয়সে বিয়ে করে পুরুষ মানুষটির বাড়ীতে এসে পুরো পরিবারের সেবা করবে। এও ছিল পুরুষ শাসিত সমাজের ষড়যন্ত্র- কম বয়সী মেয়ে কে বিবাহ করা, যাতে স্ত্রী রাই বিধবা হয়, পুরুষেরা নয়।

কেন এর তো উল্টোটাও হতে পারতো? স্ত্রী জাতি কি শুধু রান্না, আর সেবা করার জন্যই তৈরি হয়েছে? এগুলো সঠিক নয় বলেই তো সমাজ বদলাচ্ছে। তবে আজ আর সেই ছবি নেই।

হে পুরুষ জাতি! আপনারা কি তৈরি? স্ত্রীর বাবা মা এর দায়িত্ত্ব নিতে? স্ত্রীর পরিবারের সকল সদস্যের সেবা করতে? তাহলেই আপনারা পারবেন ডিভোর্স কে আটকাতে। নতুবা নয়।

তবে এই সমস্যাও এখন অনেকখানি কমেছে। বিবাহের পরে বেশীরভাগ নারীই তার স্বামীর সাথে আলাদা ঘরে থাকে। একটা সমস্যা মিটতে না মিটতেই অন্য সমস্যা হানা দিয়েছে। পুরুষ মানুষটির পিতা মাতারেই বেশী যাতায়াত সেই আলাদা ঘরে। যে নারী তা পছন্দ করে না, এখনও সমাজ তাকে বাজে চোখে দেখে।

আমি সেইসব পুরুষ মানুষ দের উদ্দ্যেশ্যে বলবো- নিজের স্ত্রী কে দোষারোপ করার আগে একবার নিজেকে ওই জায়গায় বসিয়ে ভাবুন। আপনার কি ভালো লাগতো- যদি আপনাদের বাড়ীতে আপনার স্ত্রীর বাবা মা প্রায়ই থাকতেন?

মানুষের মন বড্ডই সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে। এখন কেউই শশুর বা শাশুড়ির সাথে থাকতে পছন্দ করেন না। অনেক টা আধুনিকতার ফারাক রয়ে গেছে এই দুই জেনেরেশনের মধ্যে।

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে পুরুষ মানুষটির বাবা মা সর্বক্ষণ তাদের একমাত্র ছেলেকে  ডিভোর্সের জন্য ইন্ধন যোগায়, বাড়ীর বউ এর নিন্দা করতে থাকে। উনারা ভাবেন যে তাঁদের ছেলে পর হয়ে যাচ্ছে, সব সময় বউ এর কথাই ভাবে। এর পরিনাম ও ডিভোর্সের দিকে ঠেলে দেয়।

৭। স্ত্রীর বাবা মা

আগেকার দিনে স্ত্রীর বাবা মা এর ডিভোর্সের পিছনে কোন ভুমিকাই ছিল না, বরং তারা দুঃখ প্রকাশ করতেন, পরিবারকে জোড়া লাগাবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু আজ কোথাও কোথাও এর অন্য ছবিও দেখা গেছে।

কোন কোন ক্ষেত্রে ডিভোর্সের পিছনে স্ত্রীর বাবা মাই প্রধানত দায়ী হয়ে থাকে। একমাত্র মেয়ে কে জামাই নাকি অনেক খাটায়। জামাই তো শুধু নিজের বাবা মা কে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পুরুষ মানুষ টির বাবা মা এর শরীর যদি ভালো না থাকে, উনাদের দেখাশোনা করার মতো যদি আর কেউ না থাকে, তাহলে তো ওই পুরুষ মানুষটিকে দায়িত্ত্ব নিতেই হবে। এইসব ক্ষেত্রে স্ত্রীর বাবা মারাই সেই দম্পতির একমাত্র সন্তানের মন কে গোপনে দুই ভাগ করে ফেলে।

বিবাহ বিচ্ছেদ এর প্রতিকার

অন্ধকার এরও গুরুত্ত্ব আছে। অন্ধকারের অস্তিত্ত্ব আলো কে ঘুচানোর জন্য নয়, বরং আলোর মাহাত্ম্য বাড়ানোর জন্য। তবে চেষ্টা করবেন আলোর শিখাকে টিকিয়ে রাখার। কিভাবে? দেখে নিন সেই উপায়গুলো।

১। পরস্পর পরস্পরকে সময় দিন। মুবাইলের জায়গায় পরিবার কে গুরুত্ব দিন।

২। বাচ্চা থাকলে, বাচ্চা কে ব্রিজ হিসেবে কাজ করতে শেখান। বাচ্চা কে বলুন -“যখন আমি তোমার মা কে বকবো, তুমি আমাকে থামাবে , আর বকবে যাতে আমি তোমার মা কে না বকতে পারি। আর যখন তোমার মা আমাকে বকে, তখন তুমি তোমার মা কে থামাবে।”

৩। সম্পর্ক কে মজবুত করে তুলতে এক অপরের ভালো গুন গুলো তুলে ধরুন।

৪। একে অপরের বাবা মা এর দায়িত্ত্ব নিন।

৫। আপনি আপনার স্ত্রীর বাবা মা এর দেখাশুনো করার দায়িত্ব নিন। আর আপনার স্ত্রী কে বলুন আপনার বাবা মা এর দায়িত্ত্ব নিতে।

৬। আপনার মা বাবা যদি কখনো অন্যায় করে আপনার স্ত্রীর/ স্বামীর সাথে কিম্বা কোন বাজে মন্তব্য করে আপনার স্ত্রীর/স্বামীর সম্পর্কে, তাহলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন। বাবা মা কে আলাদা করে ভালো করে বোঝান।

৭। আপনার বাবা মা কে আপনার আর আপনার স্ত্রীর/ স্বামীর সব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে বারন করুন। আপনাদের সম্পর্কের মাঝে অন্যদের আসতে দেবেন না।

৮। আপনার স্ত্রী/ স্বামী যদি আপনার বাবা মা এর ব্যাপারে কটু মন্তব্য করে, আপনি আপনার স্ত্রী/স্বামী কে ভালো করে বোঝান।

তবে এই উপায়গুলো সম্পর্ক মজবুত থাকতে থাকতেই দুই পক্ষই যদি অবলম্বন করে থাকেন, তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদ এর মতো ঘটনাই ঘটবে না- এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন। কিন্তু যদি এক পক্ষই এই সব কিছু উপায় কে গুরুত্ত্ব দিতে থাকে আর অন্য পক্ষ শুধুই মজা নিতে থাকে, দায়িত্ব নেয় না- তাহলেই আলোর শিখা দপ দপ করতে শুরু করে।

এইসব কিছু করার পরেও যদি সম্পর্কের আলোর শিখা কে টিকিয়ে রাখতে না পারেন, তাহলে নতুন বাতি জ্বালুন।

যেখানে আমরা নিজেরাই নিজের মনের স্থিতির গেরেন্টি দিতে পারি না, সেখানে অন্যের মনের স্থিতির ব্যাপারে কি করে নিশ্চিত হতে পারি? আর এই কারনেই বিবাহ বন্ধন এর দৃঢ়তাও অনিশ্চিত। কারো ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক সোনার মতো চকচক করে আবার কারো ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কে কিছু সময় পরেই মরচে পড়ে যায়। মরচে পড়ে যাওয়া সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার চেয়ে নতুন সম্পর্ক কে গড়ে তোলা উচিত।

যখন দুই পক্ষই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে, দুই পক্ষই একসাথে থাকতে পারে না, প্রতি মুহূর্তে কষ্ট ভোগ করে তখন সেই সম্পর্কের বিনাশ হওয়াই উচিত। এইসব ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদ করে নতুন জীবন শুরু করাটাই শ্রেয়।

আপনি কি অশান্তিতে ভুগছেন? আপনার পার্টনার কি আপনার থেকে আলাদা হতে চাইছেন? আপনি কি সেটা চাইছেন না? এই নিয়ে কি প্রত্যহ ঝগড়া ,অশান্তি লেগেই থাকছে? আপনি কি প্রচুর বুঝিয়েছেন, প্রচুর চেষ্টা করেছেন এই সম্পর্ক কে টিকিয়ে রাখার জন্য? তবুও কিছু লাভ হয় নি? তাহলে আর না, এবার ওই সম্পর্ক থেকে আপনিও বেরিয়ে আসুন কারন এক হাতি তালি বাজানোর ক্ষমতা সম্পর্কের নেই।

নীচে উল্লেখ করা সুবিধা গুলো দেখে নিন-

বিবাহ বিচ্ছেদ এর সুবিধা

১। অযথা সময় নষ্ট করা বন্ধ করুন । বরং ভাবুন যে এরপর থেকে অনেক অন্য কিছু ভালো কাজ করার সময় পাবেন আপনি।

২। যাকে তাকে ভালো উপদেশ দেওয়া শোভা পায় না। যারা উপদেশ নেবে, যাদের আপনার দেওয়া উপদেশে কাজে লাগবে সেই জায়গায় উপদেশ দিয়ে দেখুন, আপনার মন কত ভালো হয়ে যাবে।

৩। আপনার জীবন আপনার হাতে। তাই সিদ্ধান্ত নিন আর জীবন কে নতুন করে সাজাবার সুযোগ যখন পেয়েছেন হাত ছাড়া করবেন না।

৪। আপনার মতোই কেউ হয়তো তার জীবনে আঘাত পেয়েছে। আর এখন আপনার সময়। আপনি কি পারেন ওই আরেকজনের আঘাত কে নির্মূল করতে?

৫। যদি আবার নতুন করে বিবাহ বন্ধনে লিপ্ত না হতে চান, তাহলে দৃষ্টি ভঙ্গী টাকে বদলে ফেলুন। ভাবুন এটা আপনার কর্মের সময়। আপনার অফিসে আর কিছু নতুন কাজ শিখে নিন। নিজের কাজের ক্ষেত্র কে প্রসারিত করার এটাই সুযোগ।

বিবাহ বিচ্ছেদ এর অসুবিধা

১। বিবাহ বিচ্ছেদ সন্তানের জীবন কে নানান ভাবে প্রভাবিত করে

দুই পক্ষই মেনে নিতে পারলে সেরকম খুব একটা অসুবিধে থাকে না। তবে যদি সন্তান থেকে থাকে, তাহলে সন্তানের ওপর কিছুটা প্রভাব তো পড়েই। তবে সেই প্রভাব কিন্তু কাটিয়ে ওঠার দায়িত্ব আপনার যিনি সন্তান কে কাছে রেখেছেন।

যখন সেই সন্তান বড় হয়ে ওঠে, তখন সে বুঝতে শিখে। বিভিন্ন সন্তানের আধার বিভিন্ন হয়, ভীতও বিভিন্ন হয়। কিছু সন্তান এই বিবাহ বিচ্ছেদ কে খুব সুন্দরভাবে সহজভাবে মেনে নিতে পারে, আবার কিছু সন্তান মনের ভেতরে এক তীব্র যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে।

২। বিবাহ বিচ্ছেদ এ এক পক্ষের বিশ্বাসে আঁচড় কাটে।

যে পক্ষ বিবাহ বিচ্ছেদ চায় না, অপরদিকে তার পার্টনার বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে – এমতাবস্থায়, সে আর অন্য কাউকেই সহজে বিশ্বাস করতে পারে না।

৩। বিবাহ বিচ্ছেদের সময় টা সন্তানের জীবন কে নেগেটিভ চিন্তায় ভরিয়ে তোলে।

উপসংহার

সময় নিজের গতিতে বয়ে যায়। সময় যদি কাউকে নিজের ভেলা থেকে বাদ দিয়ে দেয়, তাহলেও সেই পরিবার তাকে বাদ দিয়েই সেই ভেলায় চলতে থাকে। জীবন কখনো থেমে থাকে না। তাই আপনার ও উচিত থেমে না থাকা। যদি আপনি বিবাহে সুখী না হন, তাহলে বিচ্ছেদ অবশ্যই করতে পারেন, কিন্তু অন্য পক্ষের ক্ষতি যেন না হয় সেইদিকে লক্ষ্য রাখাটা খুবই দরকার। তা না হলে, যে আঘাত আপনি আজ অন্যকে দিচ্ছেন, মনে রাখবেন সেই আঘাত কিন্তু আপনিও পেতে পারেন।

আপনার পার্টনার যদি আপনার থেকে আলাদা থাকতে চায় আর আপনি যদি না চান, তাহলে আপনি চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন তাকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু এই চেষ্টার জন্য নিজের অমূল্য সময় কে নষ্ট করবেন না, নিজের মন এর স্ট্যাবিলিটিও হারাবেন না। বিবাহ বিচ্ছেদ আটকাতে না পারলে, নিজেকে দোষী ভেবে কষ্ট পাবেন না। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট