আমার মা রচনা [Essay on ‘My Mother’]

আমার মা

আশা করি তোমরা সকলে ভালো আছো। পরীক্ষার জন্য অনেক রকমের রচনা তোমরা নিশ্চয়ই তৈরি করেছো। মা কে নিয়ে যখন কোন রচনা লিখতে হয় আমাদের সকলের মনে অনেক অনুভূতি খেলা করে। এই রচনা যেন সবার চেয়ে আলাদা। মনে হয় যেন পাতার পর পাতা লিখা যাবে। কিন্তু পরীক্ষার হলে পাতার পর পাতা লিখলে তো চলবে না। তোমাদের কে পুরো রচনা টা গুছিয়ে লিখতে হবে।

তোমরা যদি যৌথ পরিবার থেকে এসেছ, তাহলে খেয়াল করে দেখবে বাড়ীতে নানান লোক থাকলেও, মা কাছে এলে একটা আলাদা অনুভব হয়। আর যদি একান্নবর্তী পরিবার থেকে এসেছ, তাহলে খেয়াল করে দেখবে মা এই যেন পৃথিবী। কারন বাবা রা সাধারনত চাকরি বা ব্যবসার জন্য ব্যস্তই থাকেন।

আবার যদি তোমাদের মা চাকুরীজীবী হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় লক্ষ্য করেছো, তারা কিভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে একদিকে তোমাদের কে আর অন্যদিকে চাকুরী কে সামলে থাকে। তোমরা তোমাদের দ্বারা দেখা ঘটনা গুলোই সুন্দরভাবে সাজিয়ে লিখবে।

তাহলে শুরু করা যাক আমার মা রচনা টি।

আমার মা রচনা

ভূমিকা

একটি মাত্র শব্দ ‘মা’ কিন্তু ক্ষমতা যেন হাজার ও শব্দের বেশী। ‘মা’ শব্দ টির মধ্যেই যেন জাদু লুকিয়ে রয়েছে। অন্য কোন শব্দে মনে হয় না সেই ম্যাজিক্যাল পাওয়ার আছে। মা সকলের জীবনেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। মা এর হাত ধরেই প্রতিটি শিশু পৃথিবীর আলো দেখে থাকে। এমন কি বাবার সাথে পরিচয়ও মা এর মাধ্যমেই হয়ে থাকে। জীবনের সমস্ত দুঃখকষ্ট মোচনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হল মায়ের আঁচল।

সকল কে ছেড়ে থাকা যায়, কিন্তু মা কে ছেড়ে যায় না। মা এর ওপর বেশীক্ষণ অভিমান করেও থাকা যায় না। সে যতই মান-অভিমান জমুক না কেন, সেই অভিমান মিটিয়ে নেওয়ায় যেন নিজেরেই লাভ হয়, যেন আলাদা এক শক্তি পাওয়া যায়।

শৈশবে মা

যৌথ পরিবার । বাড়ি তে প্রচুর বাচ্চা। মা এর এত সময় ছিল না । সারাক্ষন রান্না করে যেতে হত। তবুও মাঝে মাঝে যখন মায়ের আদর পাওয়া যেত, যেন সেই টুকু আদরের মধ্যেই সবচেয়ে বেশী ভিটামিন আর এনার্জি থাকতো। সে এক অদ্ভুত আনন্দ। মনে পড়ে- আমি শুধু অপেক্ষা করতাম কখন সবচেয়ে বেশী ভিটামিন যুক্ত খাবার টি খাব। আর সেই খাবার আমার কাছে মায়ের আদর ছাড়া কিছুই নয়।

একবার আমি স্কুলে খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। পড়ে যাওয়াতে শুধু ইচ্ছে করছিল মায়ের কাছে যাই। একটু আঘাত তো লেগেছিল। কিন্তু যখন মা ,ও মা বলে ডাকছিলাম, ব্যথা যেন কমে যাচ্ছিল। আর মা বলে ডাকার কিছুক্ষন পরেই যা দেখি, সেই ক্ষণের অনুভূতি আজও ভুলতে পারি নি। আমি পড়ে গিয়েছি শুনেই মা রান্না ফেলে স্কুলে চলে এসেছিল। আমি সেদিন মা কে দেখে এতোটাই অবাক হয়ে গিয়েছিতা যে ব্যথা যেন এক নিমেষে মিলিয়ে গিয়েছিল।  মায়ের চোখে মুখে ছিল শুধুই টেন্সেন।  

সেদিনেই স্কুলে যাওয়ার সময়ে মা আমাকে বলেছিল একটু সাবধানে খেলাধুলা করতে। অন্য কোন দিন এরকম কথা বলে নি। মা দের সিক্সথ সেন্স ও খুব বলবান। মা এর আমাকে নিয়ে এত অস্থিরতা দেখে আমি সেদিন থমকে গেছলাম। বাড়ীতে এত সদস্য, কিন্তু সেদিন আমি আর কারো মনে আমাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা দেখে নি।

যৌবনে মা

মা শুধু রান্নাঘরেই সামলায় এমন টা নয়, আমার পুরো যৌবনে আমাকে সঠিক পথ দেখানো তে ও মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। যৌবনের যে বাঁক গুলোতে গাইডেন্সের অভাবে ছেলে-মেয়ে রা হোঁচট খেয়ে থাকে, আমাকে সেইভাবে কোনদিন হোঁচট খেতে হয় নি , শুধুমাত্র মা এর গাইডেন্স এর জন্য। শৈশব থেকে যৌবনে পা রাখার সময়ে জীবনে নানান রকমের হরমোনের জন্য যে পরিবর্তন আসে, সেই সব সম্পর্কে আমি ছিলাম ওয়াকিবহাল। মা এর সাথে আমার খুবই গাঢ় ঘনিষ্ঠতার জন্য আমাকে কোনদিন কোন সমস্যার মুখে পড়তে হয় নি। বরং আমার বন্ধু-বান্ধবীদের কিভাবে সাহায্য করবো, সেই পথ ও মা আমাকে দেখিয়েছিল। এমন কি আজও মা আমাকে পথ দেখায়।

জীবনের কঠিন মুহূর্তে মা

সবচেয়ে ভাল বন্ধুর সাথে ঝগড়া হওয়াতে একটুও বিচলিত হয় নি আমি আর তা সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র মায়ের জন্য। খুব কম সময়েই সেই ঝগড়া মিটেও গিয়েছিল। আম্ফানের সময়ে সেই বড় বাড়ীতে শুধু মা আর আমি ছিলাম। বাবা তখন বাড়ীতে ছিলেন না। সমস্ত কিছু মা একা হাতে সামলেছিল। মা কাছে থাকলে, পৃথিবীর কোন অন্ধকারই আমার কাছে অন্ধকার লাগে না। মা পাশে থাকলে মনের মধ্যে এক অসম্ভব জোর আসে যা কোন ভাষা দিয়ে আমি প্রকাশ করতে পারবো না।

জীবনের অনেক কঠিন মুহূর্তে বাবা, কাকু ওদের কাছে পাই নি, কিন্তু মা কে পেয়েছি। মা কে পেয়েছি এই কারনেই যে মা চায় না ওই কঠিন মুহূর্তগুলো আমি একলা থাকি। এখন মনে হয় যে কোন কঠিন মুহূর্তের সাথে টেক্কা দিতে পারবো মায়ের দেওয়া শিক্ষাগুলোর সাহায্যে।

দু একটা বন্ধুদের দেখেছি যারা ছোটবেলা মা কে হারিয়েছে। সত্যিই তাদের জীবন কিরকম জানতে চাওয়াতে মা আমায় ইচ্ছাশক্তির কথা বলে স্বনির্ভরতার পথ দেখিয়েছে। কিছুদিন পরে জানতে পেরেছিলাম আমার মা নাকি তাদের বন্ধু হয়ে উঠেছে। আমার মা তাদের ও মা হয়ে উঠেছে। আমার মাই তো তাদের ইচ্ছা শক্তি কে জাগিয়েছিল। আজ তারা সত্যিই স্বনির্ভর।

আমি যেদিন স্বনির্ভর হবো, সেদিন নাকি মায়ের দেওয়া শিক্ষা সফলতা পাবে। এই কথা মায়ের থেকে জানার পর থেকেই আমি স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টাতে।  

আমার জীবনে মা এর গুরুত্ব

জীবনের শৈশবে অক্ষরের সাথে প্রথম পরিচয় হয় মায়ের হাত ধরে। প্রাথমিক কাজ গুলো কিভাবে গুছিয়ে করতে হয় যেমন ধরো খুব সুন্দর ভাবে খাওয়া, নিয়মিত নখ কাটা, চুল ছাড়ানো, এই ধরনের সব ভাল অভ্যেসগুলো মা আমায় শিখিয়েছে। প্রত্যহ সন্ধ্যেবেলা ঈশ্বরের সামনে নতজানু হয়ে বসে এই প্রকৃতি, পরিবেশ, আর আমাদের আপনজনের এর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা আজ আমার অভ্যেস এ পরিনত হয়েছে। এইসব কিছু সম্ভব হয়েছে মা এর জন্য।

জীবনে কোন দুঃখই আজ আমাকে বিচলিত করতে পারে না। বরং সেই দুঃখ কে অস্ত্র বানিয়ে কিভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয় তাও মা শিখিয়েছে। গুরুজনদের সাথে মতবিরোধ হলে প্রয়োজনে চুপ করে যেতে হয়- এও মায়ের থেকে পাওনা শিক্ষাগুলোর মধ্যেই পড়ে।

অন্যায় দেখলে তা সহ্য না করে কিভাবে প্রতিবাদ করতে হয় তাও মা শিখিয়েছে। তবে প্রতিবাদ দেখার আগে পরিস্থিতি খুঁতিয়ে দেখে নেওয়া টা আবশ্যক। এই সব কিছু মায়ের থেকেই শেখা। মা যেন আমার কাছে সব থেকে বড় শিক্ষক। মা এর কাছে থেকে যা কিছু শিখেছি, মনে হয় না কোন বই তা শেখাতে পারবে বা কোন শিক্ষক তা শেখাতে পারবে।

উপসংহার

এখন অবধি পার হয়ে আসা জীবন টাকে যখন খুঁতিয়ে দেখি, তখন নানান ঘটনা চোখের সামনে ভেসে আসে। অদ্ভুত ব্যাপার, তার প্রতি টি ঘটনাতেই কোন না কোন ভাবে মা জড়িয়ে আছে। আর মা জড়িয়ে ছিল বলেই তো ঘটনাগুলোর কোনটাই ভয়াবহ রুপ নিতে পারে নি, বরং ঘটনার শেষে কিছু ভালই ঘটেছে। এখন অবধি জীবনে কি কি শিখেছি যখন ভাবি, তখনও অদ্ভুত ভাবে দেখি সব শিক্ষার পেছনে মায়ের ভূমিকা অপরিসীম।

আমার জীবন মা ছাড়া সত্যিই অন্ধকার। মা আমায় জীবনে চলার পথ দেখিয়েছে। অনেকে বলে সব ঈশ্বর এর দয়া, ঈশ্বর ই সব করেন। কিন্তু আমার কাছে আমার মা ঈশ্বর। এই অন্ধকার এবড়ো খেবড়ো পথে মা যেন আলো জ্বালিয়েছে। মা এর দেওয়া শিক্ষা পেয়ে আমি যেন পূর্ণ হয়েছি। যদিও এখনো অনেক কিছু শেখা বাকি আছে মায়ের থেকে।

________________________________________________________________________________________

আশা করি তোমাদের ‘আমার মা রচনা’ টি ভালো লেগেছে। যদি তোমাদের আর ছোট করে রচনা টি লিখতে হয়, তাহলে তোমরা প্রতিটি হেডলাইনে যে দুতিনটি প্যারাগ্রাফ আছে, তার শেষের প্যারাগ্রাফ টি বাদ দিতে পারো। ভালো থেকো ,সুস্থ থেকো। জীবনে অনেক বড় হও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট