কিভাবে উপস্থিত বুদ্ধি বৃদ্ধি করা যায়- ১৯ টি টিপস

আপনি কি আপনার বাচ্চার উপস্থিত বুদ্ধি নিয়ে খুবই চিন্তিত? আপনি তো তার প্রধান শিক্ষক। প্রচুর ঘষা মাজা করেন, কিন্তু তা সত্বেও উপযুক্ত ফল পান না? কিভাবে উপস্থিত বুদ্ধি বাড়ানো যায় তাই ভাবছেন?

এক মাত্র ছেলেকে নিয়ে প্রচুর স্বপ্ন? আপনার স্ত্রী ছেলেকে বড় করার আশায় চাকুরী অবধি ছেড়ে দিলেন?

দুজনে মিলে তো এতো পড়ান, তাও চিন্তায় রয়েছেন? আর মনে মনে ভাবছেন, ছেলের বুদ্ধি যদি একটু থাকতো। একটু কেন অনেক বুদ্ধিই আছে আপনার ছেলের মধ্যে।

আপনি যখন বাজার থেকে একটা বটি কিনেন, নতুন সেই বটি তে প্রচুর ধার থাকে। সেই বটিকে আপনি যদি দীর্ঘদিন ব্যবহার না করেন, বটির ধার ক্রমশ কমতে থাকে। তবে কয়েক মাস ফেলে রাখা বটিকে ধার দিয়ে তার ধার বাড়ান যায়। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক বছর ফেলে রাখা বটির ধার বাড়ান যায় না।

একইরকম ভাবে, আপনার বাচ্চার বুদ্ধি বাড়ানোর উপায় আছে কিন্তু খুব বয়স হয়ে গেলে তা বাড়ানো প্রায় অসাধ্য হয়ে ওঠে।

দেখে নেওয়া যাক উপস্থিত বুদ্ধি বাড়ানোর উপায়গুলো কি কি।

উপস্থিত বুদ্ধি বাড়ানোর উপায়:

১। ইচ্ছাশক্তি

The measure of intelligence is the ability to change.

Albert Einstin

ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কি না জয় করা যায়? ইচ্ছাশক্তি যখন প্রখর হয়, তখন সমস্ত রকম পরিবর্তন এর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া যায়।

ইচ্ছা শক্তি আর আত্মবিশ্বাস - এই দুটোকে বাড়িয়ে বুদ্ধি বাড়ানো যায়।
ইচ্ছা শক্তি

এই ইচ্ছাশক্তির তারতম্যের জন্যই তো বিভিন্ন বাচ্চা বিভিন্ন রেজাল্ট করে থাকে। এই ইচ্ছাশক্তিকে কিভাবে বাড়াবেন, ভাবছেন?

একটা বাচ্চা মাটির মতোই নরম থাকে। আপনি তাকে দিয়ে আপনার ইচ্ছেমতো তৈরি করতে পারেন। তবে বাচ্চাটি যতই বড় হতে থাকবে এই ফ্লেক্সিবিলিটি ততই কমতে থাকবে।

তাই খুব কম বয়সেই ইচ্ছে শক্তি বাড়িয়ে তুলুন-

  • মোটিভেশনেল গল্প শোনান
  • প্রত্যহ সকালে জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার কথা বলুন
  • সাহস যোগান
  • উৎসাহ দিন
  • বীর নর নারী পুরুষের জীবন কাহিনী শোনান
  • সফলতা না, ব্যর্থতার গল্প শোনান

এই ৬ টি জিনিষ নিয়মিত বলতে থাকুন। এইসব বলা শুরু করুন ৫-৬ বছর বয়স থেকেই। চালিয়ে যান ১০-১১ বছর বয়স অবধি। তারপর কি যে অমূল পরিবর্তন আসবে আপনার বাচ্চার মধ্যে তা আপনার চোখে পরিষ্কার বোঝা যাবে।

২। চোখ, কান খোলা রাখা

The ability to observe without evaluating is the highest form of Intelligence.

চোখ, কান খোলা রাখতে হবে। আর এই ব্যাপারে আপনাকেই আপনার বাচ্চাকে মনে করিয়ে দিতে হবে। যেমন ধরুন- আপনার বাচ্চা ওয়ার্ড প্রব্লেম সল্ভ করার সময়ে যখন ভুল করে থাকে, বেশীরভাগ ভুল ভালো করে না দেখার জন্য হয়।

আপনি তা বারে বারে বাচ্চাকে মনে করিয়ে দিন। রেগে, বোকে নয়। শান্ত মাথায়, ভালোবেসে তাকে মনে করিয়ে দিন যে চোখ কান খুলে যে কোন কাজ করা উচিৎ।

৩। পরিবেশ

আপনার বাচ্চার বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য আপনাকেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে ব্রেনের সেল গুলো ডেভেলপড হয়ে থাকে।

যেমন বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন গাছ বেড়ে ওঠে, ঠিক সেইরকম বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন প্রতিভা জন্ম নেয় এবং বিভিন্ন প্রতিভা বেড়ে ওঠে।

বাচ্চা গর্ভে থাকাকালীন যদি আপনি বাড়ীর পরিবেশ ঠিক করতে পারেন, তাহলে তো অতি উত্তম। সেক্ষেত্রে আপনি তো বুদ্ধি সম্পন্ন সেল দিয়েই দিয়েছেন বাচ্চার মধ্যে।

এরপর আপনি প্রশ্ন করতে পারেন যে কি রকম পরিবেশ চাই বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য?

একটা স্টাডি রুম বানান। সাজিয়ে রাখুন নানান টাইপের বই। বাড়ীতে হয়াইট বোর্ড লাগান। প্রত্যহ সকালে সেখানে দুটো পাযল কোশ্চেন দিয়ে রাখুন। আপনিও আপনার বাচ্চার সামনে কিছু না কিছু পড়ুন।

বাচ্চার সামনে বিনা কারনেই বসে থাকবেন না কিংবা অলসতা প্রদর্শন করবেন না। বাচ্চার সামনে যে কোন কাজ ফেলে রাখবেন না। কাজ পোস্টপোন করবেন না।

আপনি যে সর্বদাই কিছু না কিছু কাজে ব্যস্ত তা যেন বাচ্চার চোখে পড়ে।

হয়াইট বোর্ডে দেওয়া প্রশ্নগুলো আপনি এবং আপনার বাচ্চা একসাথে বসে প্রত্যহ সল্ভ করুন।

৪। কৌতূহল

যার কৌতূহল বেশী সেই তো বেশী জানবে। কৌতূহল এমন এক জিনিষ যা আমাদের সকলকে সামনে দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

তবে খারাপ ব্যাপারে কৌতূহল বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কৌতূহল যেন জ্ঞানের জন্য হয়। খিদে যেন জ্ঞানের জন্য হয়।

৫। চারিপাশ থেকে শেখা

Intelligence plus character- that is the goal of true education.

Martin Luther King

চারিপাশ থেকে যে কেউ তখনই শিখতে পারবে যদি সে পূর্ববর্তী স্টেপ্সগুলো ফলো করে। যেমন ধরুন, ইচ্ছেশক্তি থাকলে, চোখ কান খোলা রাখলে, পরিবেশ ভালো হলে তবেই কেউ চারিপাশ থেকে শিখতে পারে।

বন্ধুদের থেকে, স্কুল থেকে অনেক কিছুই শেখা যায়। আপনি আপনার বাচ্চাকে প্রত্যহ জিগ্যেস করুন যে সে আজ বন্ধুদের থেকে বা স্কুল থেকে কি শিখেছে।

বাচ্চাকে উৎসাহ দিন এই বলে যে চারিপাশ থেকে বা আশপাশ থেকে প্রত্যহ তাকে কিছু শিখতে হবে আর তা আপনাকে গল্পের ছলে বলতে হবে।

৬। শাকসবজি এবং ফলমূল

শাকসবজি, ফলমূল- এইসব ভালো খাবার খেয়েও বুদ্ধি বাড়ানো যায়।
সাস্থ্যকর খাবার

জাঙ্ক ফুড পরিত্যাগ করুন। আমাদের শরীর অসংখ্য সেল দিয়ে তৈরি। আমরা যা খাই, তারই খাদ্যরস প্রতিটি সেল এর মধ্যে যায়। আর এইভাবে সেল গুলো পুষ্ট হয়ে ওঠে।

তাই আমরা যদি জাঙ্ক ফুড খাই, তাহলে তো তেল, মশলা এইসবই যাবে আমাদের সেল এর মধ্যে।

যেমন আপনি ইনপুট দেবেন সেইরকম আউটপুট পাবেন।

আর এই শাকসবজি এবং ফলমুল – এইসবই তো উন্নত মানের ইনপুট যা উন্নতমানের আউটপুট দিয়ে থাকে।

তাই আপনার বাচ্চাকে প্রত্যহ বেশী পরিমানে শাক সবজী এবং ফলমূল খাওয়ান।

৭। জল পান

জলের আরেক নাম জীবন। জল আমাদের খাবার হজম হতে সাহায্য করে। আবার জল আমাদের শরীরের দূষিত পদার্থগুলোকে বাইরে বার করতে সাহায্য করে।

তাই আপনি আপনার পুরো পরিবার কে প্রচুর পরিমানে জল খাওয়ান।

৮। ব্যায়াম

গবেষণা দ্বারা প্রমানিত যে ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কের সাইজ বাড়ে।

বাচ্চারা তখনই ব্যায়াম করবে যখন তারা দেখে যে তাদের বাবা মা ,পুরো পরিবার নিয়মিত একটা নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম করেন।

তাই সবাই মিলে একসাথে প্রত্যহ সকালে কিংবা সন্ধ্যেতে ব্যায়াম করুন।

৯। মেডিটেশেন

মন সংযোগ করুন- বুদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়বে।
মেডিটেশেন

মেডিটেশেন করলে মনঃসংযোগ বাড়ে, একাগ্রতা বাড়ে।

যদি মেডিটেশেন করতে না পারেন বা অভ্যেস না থাকে, কোন একজন ঈশ্বরের ফটোর দিকে একটানা -৫-১০ মিনিট তাকিয়ে বসে থাকুন।

১০। পর্যাপ্ত ঘুম

যে কোন মেশিন চালাতে গেলে যেমন রাত্রে তা সুইচ অফ করে রাখতে হয় যাতে করে মেশিনটি দীর্ঘ বছর ধরে সুস্থভাবে চলতে পারে।

ঠিক তেমনি, আমাদের শরীরও একটি মেশিন। তাই এই মেশিনটিরও রেস্ট নেওয়া আবশ্যক। বাচ্চাদের ৯ ঘন্টা ঘুম, আর তরুণদের এবং এডাল্টদের ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম অবশ্যই দরকার।

রেস্ট নিলে আমাদের ব্রেনের সেলগুলো ফ্রেশ হয়ে ওঠে।

১১। শকুন্তলা দেবীর পাযল সমাধান করা

আপনার বাচ্চাকে প্রায়ই পাযল সল্ভ করতে বলুন। আপনিও তার সাথে করুন। আপনি আপনার বাচ্চাকে উৎসাহ দিন যে সে সল্ভ করতে পারবে।

১২। সুডোকু, ধাঁধা

অনেকে খবরের কাগজেও সুডোকু, ধাঁধা প্রত্যেকদিন দেওয়া থাকে। এই টাইপের জিনসগুলো, আপনি আপনার বাচ্চাকে প্রত্যহ ১ টা হলেও সল্ভ করতে বলুন।

১৩। প্রচুর পরিমানে অঙ্ক কষা

লক্ষ্য রাখুন –  আপনার বাচ্চা যেন প্রত্যহ প্রচুর পরিমানে অঙ্ক কষে। যতই সে অঙ্ক কশবে ততই তার বুদ্ধি বাড়বে।

১৪। নতুন কিছু করা

বাচ্চাকে নতুন কিছু করার জন্য উৎসাহ দিন। আপনিও বাচ্চার সাথে অংশগ্রহণ করুন।

১৫। শুধু শুধু বসে না থাকা

শুধু শুধুই বসে থাকবেন না। আর লক্ষ্য রাখবেন আপনার বাচ্চাও যেন শুধু শুধই বসে না থাকে।

কাজ না থাকলে, গান শুনতে বা ছবি আঁকতে বলুন।

১৬। দাবা, ব্রেনভিটা গেম খেলা

দাবা খেললে বুদ্ধি বাড়ে
দাবা

 গেম যদি খেলতেই হয়, দাবা, ব্রেন ভিটা গেম গুলো যেন সে খেলে- এই ব্যাপারে আপনি লক্ষ্য রাখুন।

১৭। ব্যস্ততা

ওই যে বললাম যে বটিটা আপনি বেশী ব্যবহার করেন, সেই বোটির ধার বেশী হয়।

ঠিক তেমনি আপনার বাচ্চা যত বেশীই নতুন নতুন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখবে, ততই তার বুদ্ধি বাড়বে।

১৮। জীবনে বড় লক্ষ্য তৈরি করা

Intelligence without ambition is a bird without wings.

Salvador Dali
লক্ষ্য ফিক্সড করুন আর সামনের দিকে এগিয়ে যান।
লক্ষ্য

খুব ছোট বাচ্চারা বড় লক্ষ্য তৈরি করতে পারবে না ঠিকই কিন্তু তাতে কি? আপনি তো আছেন তার মধ্যে লক্ষ্যের বীজ বোনার জন্য।

আপনি যদি তার কানের কাছে রোজ বলতে থাকেন যে তাকে বড় হতেই হবে, তাকে বিজ্ঞানী হতেই হবে, দেশের উন্নতির জন্য নতুন কোন প্ল্যান আনতেই হবে, তাহলে সেও যতই বড় হতে থাকবে ততই লক্ষ্য পূরণ করার স্বপ্ন দেখতে থাকবে।

লক্ষ্য একবার স্থির হয়ে গেলে, সেই ব্যাক্তি তা পুরনের জন্য সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখবে। আর নিজেকে ব্যস্ত রাখতে গেলে, ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে ফ্রেশ রাখতে হলে, নানান রকমের কাজে যুক্ত হতেই হবে।

১৯। কল্পনাশক্তি

The true sign of Intelligence is not knowledge but imagination.

Albert Einstein

কল্পনা শক্তি বাড়ানোর জন্য টিভি যাকে IDIOT BOX বলা হয়ে থাকে দেখা বন্ধ করতে হবে। আপনি লক্ষ্য রাখবেন আপনার বাচ্চা যেন টিভি না দেখে।

বই পড়লে কল্পনা শক্তি বাড়ে। আপনি নিজে লক্ষ্য করে দেখবেন যে আপনি যখন কোন গল্প বই পড়েন, আপনার মনের মধ্যে ওই সব কিছু নিয়ে ছবি ভাসতে থাকে।

আমাদের মনের বিশাল শক্তি। আপনি যা কিছু পড়বেন, মন তাই এঁকে দেবে আপনার মনে।

বই পড়লে কল্পনাশক্তি বাড়ে। এতে উপস্থিত জ্ঞান বাড়ে।
ব্রেন

এই ১৯ টি উপায় অবলম্বন করলে আপনার বাচ্চার উপস্থিত বুদ্ধি দিনে দিনেই বাড়তে থাকবে। তবে এই সবকটি স্টেপ্স বাচ্চাকে ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে বুঝিয়ে করাতে হবে। মারধোর করে বাচ্চার ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ফল নাও পেতে পারেন।

2 thoughts on “কিভাবে উপস্থিত বুদ্ধি বৃদ্ধি করা যায়- ১৯ টি টিপস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট