বায়োডাটা কিভাবে লিখতে হয়-সহজ কিছু টিপস

সিভি/বায়োডাটা কিভাবে লিখবো

বইয়ের কভার আর সূচীপত্র দেখে কিছুটা হলেও বইটার ভেতরে কি আছে তা যেমন বোঝা যায়, ঠিক তেমনি আপনার বায়োডাটা আর তার হেডলাইনগুলো দেখে একজন থার্ড পার্শেন আপনার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারেন।

বায়োডাটা ঠিকঠাক না বানাতে পারলে ইন্টারভিউ এর প্রথম স্টেপই আপনি বাদ পড়ে যাবেন। সেইজন্যই বায়োডাটা হল আপনার আর ইন্টারভিউয়ার এর মধ্যে প্রথম ইমপ্রেশেন নির্মাতা।

একটা মাত্র কোম্পানি। একটা পোস্ট খালি। দেওয়া হল বিজ্ঞাপন। হাজার হাজার লোক এপ্লায় করলো।

কোম্পানি হাজার হাজার টা এপ্লিকেশেন ফর্ম পেল। কিন্তু এতগুলো ফর্ম দেখে ইন্টারভিউয়ার শর্ট লিস্ট করবেন কি করে? আর সবাইকে তো ইন্টারভিউ এর জন্য ডাকা সম্ভব নয়।

এতে কোম্পানির মালিকের সময় নষ্ট। তাই তো আপনার বায়োডাটা ই ঠিক করবে আপনি শর্ট লিস্টেড হবেন কিনা।

সিভি বা বায়োডাটা কি?

সিভি হল আপনার পরিচয়পত্র। তবে এই পরিচয়পত্র এ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিবরন না আপনার কাজের বিবরণও থাকতে হবে।

২-৪ পাতার মধ্যে এই সব কিছু সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। আপনি সিভি কোন ভাষায় লিখবেন তা নির্ভর করছে আপনি কি ধরনের কাজের খোঁজ করছেন, আপনি কই ধরনের কোম্পানিতে চাকরি খুঁজছেন তার ওপর। সেই কোম্পানিতে কমিউনিকেশেন ল্যাঙ্গুয়েজ কি তা জেনে সেই ভাষায় সিভি লিখুন।

সাধারনত ইংরেজী ভাষাতেই সিভি লিখা হয়।

সিভি, বায়োডাটা আর রিজিউম এর মধ্যে পার্থক্য কি?

প্রথমে রিজিউম এর কথা বলি। আপনার রিজিউম এ আপনার ক্যারিয়ার সম্পর্কিত তথ্যই শুধু থাকবে। আর এই তথ্যগুলির সামারি থাকবে।

সিভি সবসময় রিজিউম এর থেকে বড় হয়। কারন এখানে আপনার ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সব তথ্যগুলির ডিটেলস থাকবে।

আর বায়োডাটা তে আপনার কর্ম সম্পর্কিত তথ্যের সামারির সাথে সাথে আপনার ব্যাক্তিগত ডিটেলসও থাকবে। ব্যাক্তিগত ডিটেলস মানে আপনার গার্জেন এর নাম, জন্ম তারিখ, ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, ইত্যাদি।

সিভি লিখার নিয়ম- কিভাবে বায়োডাটা লিখবেন?

সিভি লিখার সময়ে এই সিকুয়েন্স ব্যবহার করুন

১। হেডার এবং হেডারে কন্টাক্ট সম্পর্কিত তথ্য

হেডারের মধ্যে এই সিকুয়েন্সে লিখুন-

আপনার নাম

ই-মেল এড্রেস

ফোন নাম্বার

বাড়ীর এড্রেস

২। সিভি/ বায়োডাটা এর অবজেক্টিভ কিংবা সামারি

এখানে আপনি সিভির সামারি লিখবেন। আপনি কি করেন এবং কোন ফিল্ডে কাজ করেন। আপনি যে হাই স্ট্রেসের মধ্যেও ধীর স্থির মস্তিস্কে কাজ করতে পারেন তাও ফুটিয়ে তুলবেন। আবার এটা জানাতে ভুলবেন না যেন যে আপনি নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন।

৩। কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা

এই সেকসেনে কোন কোম্পানিতে কতো বছর কাজ করেছেন সেইসব নিয়ে মাত্র কয়েক লাইনে এক্সপিরিয়েন্স এর ডিটেলস দেবেন। যদি আপনি ফ্রেশার হয়ে থাকেন, তাহলে এই সেকসেন টি থাকবে না।

৪। স্কুল বা কলেজ বা শিক্ষা জীবনের ডিটেলস

এখানে আপনি কোন স্কুল থেকে কোন ইয়ারে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন, তা জানাবেন। কোন কলেজ থেকে কি ডিগ্রী অর্জন করেছেন তাও লিখবেন। আপনার সমস ডিগ্রীর ডিটেলস এই সেকসেনে থাকবে।

৫। প্রোজেক্ট ডিটেলস

এখানে আপনি কোন কোম্পানিতে কি কি কাজ করেছেন, সেইসব কাজ এর গুরুত্বপূর্ণ জিনিষগুলো তুলে ধরবেন। প্রোজেক্ট এর টাইটেল টাই সাব সেকসেন হবে। ফ্রেশারদের জন্য এই সেকসেন টি নয়।

৬। আপনার দক্ষতা কোন কাজে

ওপরে উল্লিখিত প্রোজেক্ট ডিটেলস ছাড়া, আর কি কি কাজ আপনি জানেন তা লিখবেন। যেমন ধরুন- বর্তমান কোম্পানিতে আপনি জাভা এর ওপর কাজ করছেন। কিন্তু আপনি পাইথন, সি, ডট নেট ভালভাবেই জানেন, তাহলে ওইসব ল্যাঙ্গুয়েজ এর নাম এই সেকসেনে উল্লেখ করবেন।

৭। পারসোনেল স্ট্রেংথ

আপনি যে খুব পরিশ্রম হলেও কাজ টা সাফল্যের সাথে শেষ না হওয়া অবধি হাল ছাড়েন না তা জানাবেন।

৮। ব্যাক্তিগত তথ্য

এখানে আপনি যা লিখবেনঃ

  • আপনার গার্জেন এর নাম
  • জন্ম তারিখ
  • ধর্ম
  • জাতি
  • লিঙ্গ
  • হবি
  • পাসপোর্ট নাম্বার (যদি আপনি বিদেশের জব খুঁজছেন)

৯। স্বীকারোক্তি

এই সেকসেনে একটা স্বীকারোক্তি দেবেন এই বলে যে আপনি যা লিখেছেন তার সব কিছু সত্য। কোন কিছু অসত্য প্রমানিত হলে তার দায় আপনার। এই জন্য কোম্পানি তার ইচ্ছে মতো ব্যবস্থা নিতে পারে।

১০। আপনার নাম আর তারিখ

স্বীকারোক্তির নীচে আপনার নাম এবং তারিখ লিখুন। আর তার নীচের জায়গাটা খালি রাখবেন যাতে করে আপনি ইন্টারভিউ এর দিনে ওইখানে সাইন করতে পারেন।

সিভি/ বায়োডাটা কিভাবে তৈরি করবো?

১। ভালো ফরম্যাট সিলেক্ট করুন

আগে দেখে নিন কোম্পানির কোন স্পেসিফিক ফরম্যাট আছে কিনা। আপনি যে কোম্পানিতে  চাকরির এপ্লায় করছেন, সেই কোম্পানির ওয়েব সাইট দেখুন। যদি তেমন কিছু উল্লেখ না থাকে, তাহলে নিজেই ফরম্যাট তৈরি করুন।

ব্যবহার করুন “Arial or Times New Roman” format। ফন্ট সাইজ দিন ১১-১২ এর মধ্যে। আর হেডলাইন গুলো দিন ১৪ থেকে ১৬ এর মধ্যে।

২। লে আউট

চারিধারে ১ ইঞ্চি মার্জিন রাখুন।

খেয়াল করবেন আপনার সিভির সমস্ত তথ্য যেন একই ভাবে থাকে মানে একটা হেড লাইন Arial এ করলেন আর পরের টা Times New Roman এ করলেন- এমন টা করবেন না। যে কোন একটা ফরম্যাট পছন্দ করে পুরো সিভি বরাবর সেটাই ফলো করুন।

হেডলাইন গুলো বোল্ড আর ইটালিক্স করতে পারেন। যদি করেন তাহলে সব হেডলাইনেই তা করবেন।

একটা নির্দিষ্ট ডেট ফরম্যাট ঠিক করুন।

৩। ফটো কি লাগাবেন?

যদি আপনার ইন্টারভিউয়ার ফটো লাগাতে না বলে, তাহলে লাগাবেন না।

আর যদি ফটো লাগাতে হয়, পরিষ্কার, সাদা বেকগ্রাউন্ড এর ওপর প্রফেশেনেল ফটো লাগাবেন।

৪। প্রচুর জায়গা খালি আছে কি?

সিভির মধ্যে প্রচুর জায়গা খালি আছে বলে, অতিরিক্ত জিনিষ লিখে সিভিটাকে ঘিঞ্জি করে তুলবেন না।

কিছু জায়গা খালি থাকাই ভালো যাতে করে ইন্টারভিউয়ার সেই জায়গা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন।

৫। সংক্ষিপ্ত করুন

To the point সিভি লিখুন। সব তথ্য দেবেন কিন্তু সংক্ষেপে।

বায়োডাটা কোথা থেকে তৈরি করবেন?

১। মেনুয়েলি

আপনি মেনুয়েলি বানাতে পারেন। এই ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড খুলে সেখানে টাইপ করুন।   

২। সফটওয়্যার কিংবা এপ্স ব্যবহার করে

সিভি বানানোর অনেক এপ্স ও আছে। আপনি অনলাইন মানে ইন্টারনেট কানেক্ট করে ওই এপ্স থেকে সিভি বানাতে পারেন। কিংবা এপ্স ডাউনলোড করে সিভি বানাতে পারেন।

বায়োডাটা বা রিজিউম বা সিভি বানানোর কি কি সাইট আছে?

অনলাইন ফ্রিতে সিভি বানাবেন? তাহলে এখানে ক্লিক করুন-

বায়োডাটা বা রিজিউম বা সিভি বানানোর কি কি এপ্স আছে?

  • Professional CV maker
  • Resume Builder
  • CV Maker / Resume maker

বায়োডাটা বানানোর সময়ে কি কি করা উচিৎ নয়?

১। মোবাইল থেকে কি বায়োডাটা বা সিভি বানানো যায়?

মুবাইলে সিভি বানালে অনেক মিসটেক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা আপনি সহজে দেখতে পান না। এমন কি ফরম্যাট ঠিকঠাক করতেও সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন।

তবে যদি খুব বড় স্ক্রিনের মুবাইল থেকে থাকে তাহলে মুবাইলে সিভি বানাতে পারেন। কিন্তু তাও খুব সাবধানে বানাবেন।

যদি আপনি এপ্স ব্যবহার করে সিভি বানাতে চান, তাহলে মুবাইল ব্যবহার করতে পারেন। কারন এই ক্ষেত্রে ওই এপ্স ই ফরম্যাট দিয়ে থাকে। এমন কি, পেরামিটারগুলোও উল্লেখ করা থাকবে। আপনি শুধু ডাটা দেবেন। অনেকটা ফর্ম ফিল আপ এর মতো।

২। অজানা তথ্য

বায়োডাটা তে এমন কিছু লিখবেন না যা আপনি জানেন না। ধরুন আপনি লিখেছেন যে আপনি জাভা ল্যাঙ্গুয়েজ এ এক্সপার্ট। অথচ আপনি তা এখন জানেন না। হয়তো একটা সময়ে জানতেন।

বর্তমানে আপনি কি কি জানেন, সেই সবই শুধু তুলে ধরবেন।

৩। বায়োডাটা তে মিথ্যে কিছু লিখবেন না

যে কোম্পানিতে আপনি বায়োডাটা জমা দেবেন সেখান থেকে ভেরিফিকেশেন হতেই পারে। তাই নিজের গুন কে বাড়ানোর জন্য মিথ্যের আশ্রয় নেবেন না। একবার যদি সত্যতার প্রমান দিতে আপনি ব্যর্থ হন, সেই কোম্পানির কাছে আপনার পথ চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

এমন কি এই বাজে ইম্প্রেশেন অন্য কোম্পানিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

৪। পুরানো সিভি বা বায়োডাটা জমা দেবেন না

যখনই কোন ইন্টারভিউ কল আসবে, সিভি জমা দেওয়ার আগে আপডেট করে নিন। ভালো করে চেক করে নিন এই তথ্যগুলোঃ

  • ফোন নাম্বার চেঞ্জ করেন নি তো? করে থাকলে তা আপডেট করুন।
  • ই-মেল আই ডি ভেলিড আছে তো?
  • কতো বছরের অভিজ্ঞতা আছে তা চেক করে নিন – বছরের সংখ্যা তো বাড়তে থাকে, তাই এটাও আপডেট করবেন।
  • যেসব জিনিষে আপনার কম জ্ঞান, তা সিভি তে রাখবেন না।
  • সিভি র শেষ পাতার নীচের দিকে যেখানে তারিখ লিখার জায়গা আছে- সেখানে সেই দিনের তারিখ লিখুন।
  • নিজের নামের বানান, মাধ্যমিক,উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রী কোর্সের নাম্বারগুলো চেক করে নিন।  
  • গ্রামার চেক করুন। যেমন ধরুন – বানান ঠিক আছে কিনা, বাক্যগুলোর গঠন ঠিক আছে কিনা, ইত্যাদি।

৫। জটিল্ভাবে সিভি বানাবেন না

খুব জটিল ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে সিভি টাকে জটিল করবেন না। কারন এখানে ইন্টারভিউয়ার আপনার ল্যাঙ্গুয়েজ দেখবেন না।

আপনি যখন নতুন কোন দোকানে যান, দোকানে ঢোকার মুখে আগে ওপরে কি ট্যাগ লাইন লিখা আছে তা দেখেন তো? ঠিক একইরকম ভাবে ইন্টারভিউয়ারদের সকলেই আগে আপনার ট্যাগ দেখতে চান। তাই বায়োডাটা আপনার চাকরির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

One thought on “বায়োডাটা কিভাবে লিখতে হয়-সহজ কিছু টিপস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট