মাসিক নিয়ে কুসংস্কার

মাসিক নিয়ে কুসংস্কার

মাসিক নিয়ে প্রচুর কথা, নিয়ম প্রচলিত আছে এই সমাজে। বহু যুগ ধরে সেই নিয়ম মেনে আসছে এই সমাজ। তবে কোন কোন যুগে কি কি নিয়ম ছিল তার হদিশ আপনি কোথাও ঠিক করে খুঁজে পাবেন না। আর আমার মনে হয় খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজন নেই বলেই খুঁজে পাবেন না। যাই হোক আজ আমি সম্পূর্ণ রূপে আমার নিজস্ব মতামত রাখবো “মাসিক নিয়ে কুসংস্কার” এই বিষয়ে।

আজ আমি এই বিষয়ে যা কিছু লিখবো তার সব কিছুর ব্যাপারে যুক্তি রেখেই বলবো। এমন কিছু বলবো না যা যুক্তিহীন। তাও যদি আপনাদের মনে হয় কথাগুলো অযৌক্তিক, দয়া করে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাবেন। আমার ভুল যদি কেউ খুঁজে বার করে তাহলে আমি সবসময়েই খুশী হয়ে থাকি কারণ এর ফলে আমি নিজেকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারি।

তাহলে শুরু করা যাক মাসিক নিয়ে কিছু কথা।

মাসিক নিয়ে কুসংস্কার।

মাসিক নিয়ে কিছু কথা

প্রজনন এর আধার হল মেয়েদের এই ঋতুস্রাব বা মাসিক। সত্যি! সৃষ্টিকর্তা কে বিশ্বাস করার জন্য এই আধারটিই যথেষ্ট, তার বেশী আর কিছুর প্রয়োজন পড়ে বলে আমার মনে হয় না। অদ্ভুত এক সৃষ্টি মেয়েদের এই ঋতুস্রাব। প্রতি মাসের তিনটে দিনে মেয়েদের শরীরে তৈরি ডিমগুলো ভেঙ্গে শরীর থেকে অশুদ্ধ রক্তের আকারে বেরিয়ে যায়। এই কারনেই তো একটা আঁশটে গন্ধ বেরোয় যেমনটা কাঁচা ডিম ভাঙ্গলে বেরোয়।

আবার যখন ওই মেয়েটির বিবাহ হয়ে থাকে, তখন মাসের ওই তিন দিনে যে ডিম গুলো মেয়েদের শরীর থেকে বেরোয় সেই ডিমগুলোর সাথে ছেলেদের শরীর থেকে বেরোনো শুক্রানুগুলোর যে কোন একটি শুক্রানু যদি ওই ডিমের মধ্যে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে, তাহলেই মেয়েটি গর্ভবতী হয়। মানে এক নতুন প্রানের তৈরি হয়। তখন ওই গর্ভবতী অবস্থায় আর মাসিক হয় না। কারন সেই ডিম্বাণুগুলো তখন নতুন প্রান তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই মেয়েটির শরীরের মধ্যেই থেকে যায়।

তাহলে বলতেই পারি যে ডিম্বানু আর শুক্রানুর মিলনে প্রানের তৈরি হয়। আর এই ডিম্বাণু বেরনোর সুচনা হয়ে থাকে ১০-১৪ বছর বয়সে যাকে আমরা ঋতুস্রাব বা মাসিক বলে থাকি। আর তাই ওই বয়সেই একজন মেয়ে নারী জীবনে প্রবেশ করে।

মাসিক হল মেয়েদের নারীত্বের পরিচয়। তাহলে মেয়েরাই নারী হবে, আর ছেলেরা পুরুষ হবে না? বিধাতার এ কি বচার? আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হবে। কিন্তু ভালো করে বিচার করে দেখলে দেখবেন যে ছেলেদেরও পিরিয়ড হয়ে থাকে। পিরিয়ড বা মাসিক মানেই কি শুধু রক্তস্রাব? মাসিক মানে হরমোনের পরিবর্তনের জন্য কিছু শারীরিক অনুভুতির পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তন তো ছেলেদের মধ্যেও দেখা যায়।

এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও অনেক মানুষের মন আজও কুসংস্কারে নিমজ্জিত। যে মন কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সেই মন কিছুতেই নিজের মনের ভেতর, বা পরমেশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে না।

প্রাচীন যুগটা ছিল পুরোপুরি পুরুষ শাসিত, কিন্তু তার মধ্যেও কিছু নেত্রী ছিল বই কি। সব নিয়ম পুরুষ মানুষ ঠিক করলেও, আমার ধারনা মাসিকের সময়ে কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় সেই সব নিয়ম নিশ্চয়ই কোন মহিলা নেত্রীই ঠিক করেছিলেন।

এরপরে আসা যাক মাসিকের এই দিন গুলোতে বাড়ীতে মেয়েদের কে কি কি করতে বারন করা হয়ে থাকে।

মাসিক নিয়ে কুসংস্কার

মাসিক হলে কি কি করা যাবে না দেখে নেওয়া যাক।

আগেকার দিনে মাসিকের সময়ে মেয়েদের কে পুরোপুরি আলাদা থাকতে হতো। এখনো কিছু গ্রামে সেই প্রথাই প্রচলিত আছে। মাসিক চলাকালীন, মেয়েটি কোন শুভ কাজ করা তো দুরের কথা, এমন কি শুভ কাজের কোন জিনিষে ছোঁয়া টাও ছিল নিষিদ্ধ।

মাসিকের ওই ৪ টে দিন ঠাকুর ঘরের কোন জিনিষে হাত দেওয়া যাবে না, পুজো দেওয়াও যাবে না, এমন কি পুষ্পাঞ্জলি দেওয়াও যাবে না। গ্রামের দিকে অনেক বাড়ীতে মা রা আচার বানায় নিজ হাতে। মাসিক চলাকালীন মেয়েটি ওই আচার ভুল করেও যদি ছুঁয়ে ফেলে, আচার নাকি নষ্ট হয়ে যায়- এমন কথা আজ ও শোনা যায়।

মাসিক চলাকালীন কোন মেয়েই তুলসী গাছে জল দিতে পারবে না, যদি জল দেয় তাহলে নাকি গাছ টি মরে যাবে। তবে তুলসী, বট ইত্যাদি এই সব গাছ মানে যেসব গাছে পুজা করা হয় সেইসব গাছ বাদ দিয়ে বাকী সব গাছে যেমন আম, জাম ইত্যাদি গাছে জল দেওয়া যায়।

তবে এইসব যে একদম মিথ্যে বা শুধুই কুসংস্কার তা আপনি ভালবাসা আর শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলসী গাছে জল দিয়ে দেখতে পারেন। কেননা আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে। আমি ওইসময়েও চান করে তুলসী গাছে জল দিই।

আজকাল অনেকেই মাথায় কাঁচা ডিম লাগিয়ে থাকে চুল ভালো করার জন্য, তখন কি কেউ তাকে অপবিত্র বলে থাকে? মাসিকের সময়ে কোন মেয়ে যদি অপবিত্র বলে গন্য হয়ে থাকে, তাহলে আমার মনে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষেই অপবিত্র। কারণ সব মানুষের শরীরের ভেতরেই মল মুত্র জমা থাকে।

মাসিকের সময়ে ঠাকুর দেওয়া যায় কি?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন কি? তাহলে পড়তে থাকুন।

আপনি কোন ঠাকুরে বিশ্বাস করেন? আপনার মনের ভেতরেও কিছু কথা কি চলে? সেই কথা গুলোর সঙ্গে কি আশেপাশের লোকজনের বলা নিয়ম গুলো ম্যাচ করে?

দেখুন সবাই নিজের সুবিধার্থে নিজের নিয়ম দিয়ে ঠাকুরের সংজ্ঞা বানিয়ে থাকে। আপনার কি মনে হয় ঠাকুরের মন এতই ছোট? যে ঠাকুরেই মেয়েদের মাসিক এর জন্ম দিল যাতে মেয়েরা বংশ টাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সেই ঠাকুরেই মেয়েদের কে অস্পৃশ্য করে রাখতে চান?

দেখুন ওই যে ফটো গুলোর পুজা করেন, ওই ফটোগুলো বাদ দিয়েও পুজা করা যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা জটিল হয়ে যায়। তাই ফটো পুজার প্রচলন। আপনি যেভাবে ডাকবেন, উনি সেইভাবেই আপনার মনের ভেতরে আপনার প্রশ্নের উত্তর কিম্বা আপনাকে পথ দেখাবেন।

আমার মনে হয় আপনি যদি সময় না পান, টয়লেট এর ভেতরেও উনার স্মরন করতে পারেন। এই পরমেশ্বর কে কোন সংজ্ঞা দিয়ে বাঁধা যায় না, তিনি সবার ওপরে, সব কিছুর ওপরে, তিনি অসীম, অনন্ত।

তাই আমি বলবো- মাসিকের সময়েও ঠাকুর ঘরে গিয়ে পুজা দেওয়া যায়। পুজার মাধ্যমে মনের ভক্তির প্রকাশ ঘটে। কিন্তু যদি আপনার সেই ভক্তি না থাকে, তাহলে পুজা দেওয়ার এত তাড়া কেন?

আপনি বড়দের সাথে ঝগড়া ঝাঁটি না করে, তর্কে না গিয়ে বরং ঠাকুর ঘরে ওই সময়ে যাবেন না। এতে আপনার আপনজন যদি খুশী থাকে, আপনি তাদের খুশী থাকতে দিন। এই কারনেই তো আপনি সেরা। অন্যদের চেয়ে আলাদা।

আর যদি আপনি পুজা না দিয়ে থাকতে পারছেন না, মন ছটফট করছে, তাহলে অবশ্যই পুজা করুন, কিন্তু বড়দের সাথে ঝামেলা না পাকিয়ে। আপনি হয়তো ভাবছেন সেটা সম্ভবই নয়। অবশ্যই সম্ভব, শুধু পুজার সংজ্ঞা টাকে বদলাতে হবে।

আপনি আপনার নিজের রুমে ঠাকুরের ফটোর দিকে তাকিয়ে এক মনে প্রার্থনা করতে থাকুন কিম্বা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মেডিটেসেন করুন।

কিন্তু খেয়াল রাখবেন আপনি যখন ওই বড়দের জায়গায় পৌঁছাবেন, তখন আপনি যেন এই সব কুসংস্কারে অন্য মেয়েদের বেঁধে না রাখেন, আপনি যেন তাদের এইসব ব্যাপারে স্বাধীনতা দিতে কুণ্ঠা বোধ না করেন। আর তাহলেই একদিন আপনার মনের মতো এক উন্মুক্ত পৃথিবী তৈরি হবে।

কুসংস্কারের জন্মকথা

প্রতিটি কুসংস্কারের পেছনেই গুরুত্ত্ব থাকে। সেই সময়ের জন্য হয়তো কুসংস্কার গুলো সুসংস্কার ছিল। যুগ বদলানোর সাথে সাথে নিয়মগুলোর পরিবর্তন দরকার যা হয়ে ওঠে না। আর সেই কারনেই সেই নিয়মগুলো কুসংস্কার এর ট্যাগ পেয়ে থাকে।

আগেকার দিনে মেয়েদের ৯-১০ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যেত। মাসিক শুরু হত শ্বশুরবাড়িতেই। পরিবার গুলোও যৌথ পরিবার ছিল। মাসিকের সময়ে অনেক মেয়ের পেট ব্যথা করে, সারা শরীর ম্যাজম্যাজ করে, হাতে পায়ে যন্ত্রণা করে।

শাশুড়ি মা দের কাছে মেয়েদের জীবন কাটতো। কোন এক মহান শাশুড়িমা হয়তো দেখেছিলেন তার বউমা কিছুতেই সব কাজ করে উঠতে পারছে না। তাই যে কাজগুলো হাল্কা, যে কাজ গুলো ভালো, সেই কাজগুলো মাসিকের সময়ে বউমা কে আর করতে হবে না বলে ঠিক করেছিলেন।

এরফলে কিছুটা কাজ তো কমলো। সেই সময়ে একটু বিশ্রাম ও নেওয়া যাবে। যদিও বাড়ীর ভারী কাজ গুলো তাও সেই বউমা কেই করতে হত। কিন্তু একদমই কিছু না পাওয়ার থেকে কিছু পাওয়া তো ভালো। তাই মেয়েগুলোও সেটা মেনে নিয়েছিল।

তখনকার দিনে স্যানিটারি প্যাডও ছিল না বাজারে। এইসময়ে মেয়েরা কাপড় ব্যবহার করতো। সেই ভিজে যাওয়া কাপড় ফেলাও যাবে না। কারণ এত কাপড় পাওয়াও মুশকিল। তাই সেই কাপড় কাঁচা হত। তারপরে মেয়েরা শাড়ি পরতো। বয়সে কম বলে সামলাতে পারত না এত কিছু। এর ফলে শাড়িতে দাগ লেগে যেত।

আর সেইকারনেই ভালো কাজ গুলো ওদের করতে দিতো না।

তারপর থেকে এই নিয়ম যুগে যুগে চলে আসছে।

কিন্তু এখন আর সেই যৌথ পরিবার নেই, নেই এত কম বয়সে মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি যাওয়া । এখন খুব ভালো ভালো স্যানিটারি প্যাড চলে এসেছে বাজারে। তাই জামা কাপড়ে দাগ লাগার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

তাই এই নিয়মগুলোর এখন আর কোন গুরুত্ত্ব থাকার কথা নেই। কিন্তু যতদিন না মেয়েরা উন্নত হবে, কুসংস্কার মুক্ত হবে, এই নিয়মগুলো রাজত্ত্ব চালাবে।

 এই নিয়মগুলো যাতে ঠিকঠাক ভাবে পালিত হয় সেই দায়িত্ত্ব  কিন্তু  বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরাই নিয়ে থাকে। মেয়েরাই আরেকটা মেয়ের নিয়ম ঠিক করে। বেশীরভাগ ছেলেরা কিন্তু এইসব ব্যাপারে মাথা ঘামাই না।

তাই প্রাচীন যুগ পুরুষ শাসিত হলেও আমার ধারনা এই নিয়মগুলোর জন্ম কোন এক নেত্রীই  দিয়েছিলেন।

আপনি কি করবেন?

আপনি পরিবারের লোকজন কে ভালভাবে বোঝাবেন। তাদের কে বলুন কোন এক সময়ে কোন মেজাজি মহিলা এই নিয়ম শুরু করেছিলেন, তাতে ওই মেয়েটির ভালোই হয়েছিল। কিন্তু এখনকার এই উন্নত সমাজে এইসব নিয়ম একদম ই গুরুত্ব হারিয়েছে।

ওদের কে বলুন এখন কোন মেয়ের ৯-১০ বছর বয়সে বিয়ে হয় কি, এখন কি কেউ মাসিকের সময়ে কাপড় ব্যবহার করে?

আপনার পরিবারের লোকজন যদি সায়েন্স কে বিশ্বাস করে থাকে তাহলে অবশ্যই আপনার কথা বুঝবে। আর যদি তাও না বোঝে, দয়া করে আপনার অমূল্য সময় নষ্ট করবেন না। কেননা আপনি অন্যকে বদলাতে পারবেন না, আপনি শুধু নিজেকেই বদলাতে পারবেন।

উপসংহার

সবশেষে বলি আপনার মন কি চায়, কিসে বিশ্বাস করে সেইসব কিছুর ওপর গুরুত্ত্ব দিন। তবে এই ছোটখাটো কারনে ঝামেলা তৈরি করবেন না। মনে রাখবেন ওই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষগুলোর চেয়ে আপনি অনেক মহান ও উদার। তাই ঝগড়া বাধিয়ে নিজেকে ছোট না করাই শ্রেয়।

আশা করি বুঝতে পেরেছেন মাসিক নিয়ে কুসংস্কার গুলো কি কি, সেইসবের জন্ম হল কিভাবে, মাসিকের সময়ে ঠাকুর পুজা দেওয়া যায় কিনা। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, মন কে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করুন।

2 thoughts on “মাসিক নিয়ে কুসংস্কার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট