সংবাদপত্র কি, কি তার গুরুত্ব, উপকারিতা, অপকারিতা?

ভারতবর্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রে তিনটি বিভাগের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই তিনটি বিভাগ হল – আইন, শাসন, এবং বিচার বিভাগ। এই তিনটি বিভাগের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হল সংবাদপত্র। আর এখানে আমরা সংবাদপত্র কি, কি তার উপকারিতা সেইসব নিয়েই আলোচনা করবো।

বিশ্ব জুড়ে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ফুটিয়ে তোলাই সংবাদপত্রের প্রধান কাজ।  

সংবাদপত্র কি?

?সংবাদপত্র হল এক মাধ্যম যার দ্বারা বিভিন্ন রকমের খবর প্রচার করা হয়। বর্তমানে এই প্রচারের কাজ টেলিভিশন ও করে থাকে। এমন কি মানুষ মোবাইলেও ই-নিউজ শুনতে থাকে। এই কারনেই সংবাদপত্রের ব্যবহার কিছুটা হলেও প্রভাবিত হয়েছে।  

সংবাদপত্রের ইতিহাস

২০০৭ সালে, দৈনিক খবরের কাগজের সংখ্যা ছিল ৬৫৮০। আর সেই সব সংবাদপত্র এর চাহিদা ছিল-  প্রতিদিন ৩৯৫ মিলিয়নেরও বেশী।

প্রাচীনকালে সরকারের কর্মচারীরা বিশেষ জরুরী তথ্য যা জনসাধারনের জানা উচিত, সেইসব তথ্য  পাথরে খোদাই করতো।  তারপরে সেই পাথর এক বিশেষ জনবহুল এলাকায় রাস্তার ওপরে টাঙ্গিয়ে দিত।

ওইরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ভারতে খবরের কাগজের প্রচলন ছিল। তখনকার দিনে সব খবর রাজ কর্মচারীরা হাতে লিখতো। তারপর সেই লিখা বিশেষ বিশেষ ব্যাক্তিদের কাছে পাঠিয়ে দিত।

বাংলায় সংবাদপত্র

১৭৮০ সালে, প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকার সুচনা হয়। পত্রিকাটির নাম বেঙ্গল গেজেট। এটি মাত্র দুই পাতার একটি পত্রিকা।

তারপর ১৮১৮ সালে, রাজা রাম মোহন রায়ের সাহায্যে গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য বাংলা ভাষায় সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশ করেন।

ওই একই সালের এপ্রিল মাসে, মাসিক পত্রিকার জন্ম হয়। পত্রিকাটির নাম দিগদর্শন।

১৮২৮ সালের মে মাসে, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্ম হয়। নাম- সমাচার দর্পণ।

১৮৫৮ সালে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সোম প্রকাশ এর সুচনা করেন। এটি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা।

১৮৬১ সালে, ঢাকা প্রকাশ এর জন্ম হয়।

১৮৬৮ সালে,  সাপ্তাহিক পত্রিকা অমৃত বাজার এর জন্ম হয়।

১৮৮১ সালে, যোগেন্দ্র নাথ বসু  বঙ্গবাসী পত্রিকার সুচনা করেন।

সংবাদপত্র এর মানদণ্ড 

সংবাদপত্র প্রকাশ করার জন্য নীচের মানদণ্ড গুলি মেনে চলতে হবেঃ

যা কিছু প্রকাশ পাবে তা জনসাধারনের কাছে যুক্তি সম্মত হতে হবে।

সময়সীমা

যদি সাপ্তাহিক পত্রিকা হয়, প্রতি সপ্তাহে একবার প্রকাশ হবে। যদি মাসিক পত্রিকা হয়, প্রতি মাসে একবার প্রকাশ পাবে। এই সূচী বজায় রাখতে হবে।

সত্য খবর

সব সত্য জিনিষেই লিখা হবে।

সহজলভ্য

সংবাদপত্র জনসাধারনের কাছে সহজেই পাওয়া যাবে। এটি দোকানে, স্কুলে, লাইব্রেরী তে যেন কিছু মুদ্রার বিনিময়ে সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

সার্বজনীনতা

সংবাদপত্র সব ধর্মের জন্য হবে। এখানে কোন ধর্মের ভেদাভেদ করা চলবে না। 

সংবাদপত্রের উপকারিতা

সংবাদ পত্রের উপকারিতাগুলো দেখে নিন এক নজরেঃ

১। সব খবর হাতের নাগালে

যে কোন বিভাগের যাবতীয় তথ্য জানতে চোখ রাখুন খবরের কাগজ। ভালো মন্দ, টক-ঝাল-মিষ্টি সব রকমের খবর পাবেন এখানে। নিজের জিলার খবর, রাজ্যের খবর, দেশ-বিদেশের খবর সবই পাবেন সংবাদপত্রে।

ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি এখন কেমন আছেন যদি জানতে চান ,পড়ুন খবরের কাগজ। ভারত-চীনের সম্পর্ক জানতে চোখ রাখুন খবরের কাগজে।

২। কারেন্ট এফেয়ার

আপনি কি বিভিন্ন রকমের কম্পিটেটিভ পরীক্ষায় বসছেন? তাহলে সংবাদপত্র ভীষণভাবে জরুরী। সংবাদপত্র পড়ুন আর নিজেকে আপডেট রাখুন। কারেন্ট এফেয়ার এ হয়ে উঠুন এক্সপার্ট।

৩। কমিউনিকেশেন স্কিল

আপনি কি ইংরেজি তে উইক? তাহলে ইংরেজি ভাষার সংবাদপত্রকে করুন নিজের সাথী। প্রত্যহ ইংরেজি সংবাদপত্র পড়ুন আর বাড়িয়ে তুলুন কমিউনিকেশেন স্কিল।

৪। চাকুরীর সন্ধান

কোন কোম্পানিতে কি কি পোস্টে কতগুলো ভেকেন্সি আছে জানতে চোখ রাখুন খবরের কাগজে।

সরকারী চাকুরী, বেসরকারি সংস্থায় চাকুরী এর খোঁজ পেতে পড়ুন সংবাদপত্র।

৫। শিক্ষায় ভূমিকা

আধুনিক যুগের আধুনিকতার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সংবাদপত্রও মেতে উঠেছে নানাবিধ কাজে। প্রাচীনকালে সংবাদপত্রের কাজ ছিল সব জায়গার বিশেষ বিশেষ খবর জনসাধারনের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

বর্তমানে সংবাদপত্র ভারচুএল শিক্ষকেরও কাজ করে থাকে। সংবাদপত্রের কিছু পাতায় আলোচনা করা হয় পাঠ্য বিষয়।  

৬। চাকুরী প্রদানে সংবাদপত্র

সংবাদপত্রের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। রয়েছে তাদের বিভিন্ন নাম; যেমন- আনন্দবাজার, বর্তমান টেলিগ্রাফ, আজকাল, প্রতিদিন ইত্যাদি। প্রতিটি সংবাদপত্র কোম্পানিতে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।  

সংবাদপত্রের অপকারিতা

উপকারিতা যেখানে প্রচুর, অপকারিতার অস্তিত্ব সেখানে নিশ্চিত। দেখে নিন কি সেই অপকারিতাগুলোঃ

১। মিথ্যা খবর প্রচার

মিথ্যে খবর, আজগুবি খবর, অলৌকিক ঘটনা বরাবরই মুখরোচক, ঠিক চানাচুরের মতো। মুখরোচক খাবারগুলোর গুণাবলী যেমন কম ঠিক তেমনি মিথ্যা, আজগুবি খবরগুলো মানুষের প্রিয় খবর হলেও তা মানুষের মন কে কলুষিত করে তোলে।

আর মানুষ এই সব খবর পড়তে ভালবাসে বলেই তো সংবাদ পত্র গুলো ও মেতে উঠেছে এইসব মিথ্যে অপপ্রচারে।

২। রাজনীতির সামিল

সংবাদপত্র জড় পদার্থ হলেও মানুষে মানুষে বিবাদ ডেকে নিয়ে আসতে ওস্তাদ। রাজনীতিতে পটু সংবাদপত্র। এক পার্টি আরেক পার্টির নামে যেসব সমালোচনা করে থাকে, সেই সব কিছুই প্রতিফলিত হয় সংবাদপত্রে। সাধারন মানুষ সেইসব দেখেই নির্বাচন করে থাকে পার্টিদের। এক পার্টি ধারনা করে অন্য পার্টি সম্পর্কে। আর এইভাবেই তো সংবাদপত্র রাজনীতির সামিল হয়ে ওঠে।

৩। নেগেটিভ খবর প্রথম পাতায়

মেয়েদের অপর অত্যাচার, খুন, ভাই ভাইএ লড়াই –এইসব কিছু খবরই তো স্থান পায় সংবাদপত্রের প্রথম পাতায়। আর এইসব খবর  সকাল সকাল পড়ে সাধারান মানুষের মন হয়ে ওঠে আতঙ্কিত। ভয়ে দিন কাটাতে থাকে মানুষ। নিজের আপনজনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।

৪। মনে আঘাত

যাদের মন দুর্বল, মনস্তত্ববিদ রা তাদের কে সকাল সকাল সংবাদ পত্র পড়তে বারন করে থাকে। সংবাদপত্রের প্রথম পাতার নেগেটিভ খবর গুলো মনে আঘাত দিতে থাকে। আর এইভাবেই তো অনেক মানুষের মনে নেগেটিভ শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়।

৫। টাটকা খবর

টাটকা খবর মানে সব সবে ঘটে যাওয়া খবর গুলো জানতে হলে পরবর্তী দিনের সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আধুনিক যুগের মানুষের ধৈর্য বড্ড কম। তাই তো তারা টেলিভিশনেই দেখে ফেলে সেইসব টাটকা খবর।

সংবাদপত্র ও জনমত গঠন

গনতান্ত্রিক দেশে প্রকৃত ক্ষমতা থাকে জনগনের হাতে। সংবাদপত্র কোন এক বিশেষ পার্টির খবর বলে না। সব পার্টির মতামত তুলে ধরে জনসাধারনের কাছে। তারপরে জনসাধারনের থেকেও মতামত নিয়ে থাকে ভোটের মাধ্যমে। শেষে সেই ফলাফল প্রকাশ করে সংবাদপত্রে।

সংবাদপত্র নিয়ে উক্তি

সংবাদপত্র নিয়ে কিছু উক্তি এখানে তুলে ধরলাম-

১। আদর্শ সংবাদপত্র হল এই বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের ঘটনার সাক্ষী এক ক্যামেরা, যার মধ্যে থাকবে শুধু সচ্ছতা।

তনুশ্রী কর সেন

২। সংবাদপত্র তো এক নির্জীব আউটপুট। সাংবাদিক দেরই তো হওয়া উচিত আদর্শ নিরপেক্ষ নাগরিক।

তনুশ্রী কর সেন

৩। সাংবাদিকদের চোখ আর মন যদি পবিত্র না হয়, যদি তা রাজনীতির কালো চক্রে বদ্ধ হয়, তাহলে সংবাদপত্র হয়ে উঠবে কালো।

তনুশ্রী কর সেন

৪। সাংবাদিকরা হল আসল হিরো। শুধু সত্যবাদীই নয়, তাদের মধ্যে থাকতে হয় সৎ সাহস।

তনুশ্রী কর সেন

৫। সংবাদপত্র যেমন পৃথিবীকে করে তুলতে পারে সতেজ, ঠিক তেমনই ঢেকে দিতে পারে কালো অন্ধকারে। আমাদেরই সেইদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত যেন সংবাদপত্র হয়ে ওঠে পজিটিভ মাধ্যম।

তনুশ্রী কর সেন

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, সবাইকে ভালো রাখুন। চলুন, সবাই মিলে একসাথে এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোনা ভরে উঠুক ঈশ্বরের আশীর্বাদে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট