শিক্ষক দিবস রচনা (Shikshok Dibos Rochona-Essay on Teacher’s Day)

শিক্ষক দিবস

মাতৃ দিবস, পিতৃ দিবস, বন্ধু দিবস এর মতই এক দিবস হয়েও শিক্ষক দিবস যেন সত্যিই সবার মনে দাগ ফেলে রাখার মতই এক দিবস। এ এমন এক দিবস যা তোমার জীবনের সমস্ত শিক্ষকদের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের জীবনে কত শিক্ষক বা শিক্ষিকা থাকে- কেউ নাচের শিক্ষক, কেউ গানের শিক্ষক, কেউ পড়াশুনোর, কেউ বা খেলাধুলোর।

শিক্ষক দিবস শিক্ষক ও শিক্ষিকা দুজনের প্রতিই শ্রদ্ধা নিবেদনের দিন। সমস্ত ছাত্র ছাত্রীর কাছে এই দিবস এক অনুষ্ঠানের মতই স্মরণীয় দিন। শিক্ষক দিবস রচনার মাধ্যমে এই দিনটির গুরুত্ত্ব ফুটিয়ে তুলবো এখানে।

শিক্ষক দিবস রচনা ছাত্র ছাত্রীদের পরীক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি রচনা লিখার নিয়ম গুলো জানা থাকে, আর শিক্ষক দিবস উদযাপন করে থাক্‌ তাহলে কিন্তু তোমরা সহজেই রচনাটি লিখে ফেলতে পারবে। এক কি দুইবার শুধু পড়ে নিও, বিশেষ করে কিছু কিছু তথ্য মনে রেখে দিও। আর বাকীটা কিভাবে এই দিবস উদযাপন কর তাই নিয়ে লিখো।

তাহলে শুরু করা যাক রচনাটি। ক্লাস ফোর থেকে শুরু করে ক্লাস টেন অবধি সব ছাত্র ছাত্রীর জন্যই রচনাটি উপযুক্ত। রচনাটির শেষে বলে দেব কোন ক্লাসের জন্য কোন কোন প্যরাগ্রাফ লিখবে।

শিক্ষক দিবস রচনা

ভূমিকা

শিক্ষক ছাড়া সবার জীবন এলোমেলো। শিক্ষক আর শিক্ষিকারা আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। এমন কোন মানুষ পাওয়া যাবে না যার কোন শিক্ষক নেই। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেক দিন কিছু না কিছু শিখছি- ঘরে, বাইরে, এবং প্রকৃতি থেকে। তাই সবার জীবনেই শিক্ষক দিবসের আলাদা এক ভূমিকা আছে। তবে ছাত্র ছাত্রীদের কাছে শিক্ষক দিবস এক অনুষ্ঠান হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে।

৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস

শিক্ষক দিবসের জন্ম দিয়েছিলেন সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন। ১৮৮৮ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন তামিলনাডুর এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। ছোট বেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজীবনে বরাবর তিনি প্রথম স্থান লাভ করে এসেছেন। শিক্ষার প্রতি তাঁর এক অসম্ভব টান ছিল।

এই জোরালো টান এর জন্যই তিনি একাধারে অধ্যাপক, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ তাঁকে নাইটহুড উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ভারতরত্ন পুরস্কার পান। তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

তিনি প্রথম জীবনে মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। ছাত্র ছাত্রীদের কাছে তিনি বরাবরই খুব প্রিয় ছিলেন। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে ছাত্র ছাত্রীরা তাঁর জন্মদিন পালন করার আবদার করলে, তিনি বলেন শুধু তিনি না সকল শিক্ষকদের উদ্দ্যেশে তাঁর জন্মদিন শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হোক।

সেই তখন থেকে ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন হয়ে থাকে।

শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য

প্রতিটি মানুষের জীবনে বিদ্যালয়ের ভূমিকা অপরিসীম। আর এই বিদ্যালয়ের ভীত শিক্ষকদেরকে আঁকড়ে মজবুত হয়ে থাকে। নানান রকমের ছাত্র ছাত্রীকে শিক্ষকেরা সঠিক পথে চালনা করেন। শুধুই কি পুঁথিগত শিক্ষা দেন এই শিক্ষকেরা? না, শিক্ষকেরা জীবনে বড় হয়ে ওঠার পথ দেখান, ভদ্রতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ এর শিক্ষা দিয়ে থাকেন।

আমাদের প্রত্যেকেরই শৈশব বেলা ও যৌবন জীবনের বেশীরভাগ সময় কাটে বিদ্যালয়ে। এই জন্য বিদ্যালয় হয়ে ওঠে দ্বিতীয় ঘর। আর সেই দ্বিতীয় ঘরের গার্জেন হলেন শিক্ষক শিক্ষিকারা।

বিদ্যালয়ে শিক্ষক দিবস উদযাপন

প্রতি বছর প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক দিবস আনন্দের সাথে উদযাপন হয়ে থাকে। এই দিন বিদ্যালয়ে এক উৎসবের হিড়িক পড়ে যায়। তবে এই হিড়িক কিন্তু অন্যন্য উৎসবের চেয়ে আলাদা।

এ যেন জলজ্যান্ত সরস্বতী পুজার উৎসব। শিক্ষক শিক্ষিকারাই হলেন আমার কাছে আসল ঈশ্বর, যাঁদের অবদান আমি কোনোদিনই ভুলবো না।

আর শিক্ষার সাথে জড়িয়ে থাকে কলম, ডাইরি, বই, এইসব জিনিষগুলো। আমরা প্রতি বছর শিক্ষকদের এইসব গিফট করে থাকি। আর উনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ জানাই গ্রিটিংস কার্ডের মাধ্যমে।

এই দিন সত্যি বলতে কি পড়াশুনো এর চেয়ে বেশী শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে গল্প করতে ভাল লাগে, তাঁদের জীবন কাহিনী শুনতে ভাল লাগে, ভাল লাগে তাঁদের ছাত্র জীবনের গল্প শুনতে।

শিক্ষক দিবসের অনুভুতি

শিক্ষকদের প্রতি ভয় অন্য দিন থাকলেও এই দিন আর সেইসব থাকে না। এই দিন শুধুই ভাল লাগার আমেজ। আমরা সবাই একত্রে শিক্ষকদের প্রনাম করতে আর গিফট দিতে যাই। শিক্ষকেরা মিষ্টির ব্যবস্থা করেন।

প্রতিটি ক্লাসেই যখন শিক্ষকেরা ঢোকেন, আমরা আবদার করতে থাকি এই বলে স্যার যেন আজকের দিনটা না পড়ান। প্রতিটি ক্লাসে পড়াশোনা থেকে ছুটি নিয়ে থাকি এই দিনটা। এই প্রসঙ্গে এক অন্য রকম শিক্ষকের কথা মনে পড়ে গেল, যিনি সবার চেয়ে আলাদা। উনার ক্লাসে পড়াশোনা থেকে ছুটি পাই না কখনোই।

উনি বলেন- একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় গিফট যখন তিনি এমনভাবে পড়াবেন, আর প্রতিটা ছাত্র ও ছাত্রী সেই পড়া বুঝতে পারবে। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় গিফট যখন তাঁর ছাত্র ছাত্রীরা ভাল রেজাল্ট করে ভাল চাকরী পাবে।

এইরকম এক দুটো আলাদা শিক্ষক পেলে জীবন ধন্য মনে হয়। ওই শিক্ষকের জন্য অনেক মানুষের জীবন বদলে গেছে। লাস্ট বেঞ্চে বসা ছেলেটা আজ ফার্স্ট বেঞ্চে বসে সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করছে।

আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি এমন শিক্ষক পেয়ে। শিক্ষকেরা যেন জীবনের ভীত কে মজবুত করে তোলে। বাবা মা অবশ্যই প্রথম শিক্ষক, কিন্তু তা সত্ত্বেও যৌবনের প্রধান গার্জিয়ান এই শিক্ষকরাই কিন্তু।

শিক্ষক দিবসের দিনে জীবনের সমস্ত শিক্ষকদের মনে পড়ে। অনেক শিক্ষকদের সাথে এখন আর সেইভাবে যোগাযোগ নেই ঠিকই, কিন্তু মনের মধ্যে সকল শিক্ষকেই জায়গা করে নিয়েছেন। সেই ছোটবেলার ছবি আঁকা শেখার স্যার, টিউশেন এর সকল স্যার, স্কুলের সমস্ত স্যারদের আমি প্রনাম জানাই। আমার জীবনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।

উপসংহার

সরস্বতী পূজাতে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার মধ্যে যে আনন্দ পেয়ে থাকি, ঠিক সেই একইরকম আনন্দ শিক্ষকদের প্রনাম করে তাঁদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেওয়ার মধ্যে পেয়ে থাকি। মনে এক অদ্ভুত রকমের শান্তি লাগে।

মনে হয় যেন মাথার ওপর ছাদ আছে। মনে হয় আমি কিছু ভুল করতেই পারি না, কারণ আমি ভুল করলেই, সাথে সাথে আমার স্কুলের শিক্ষকেরা আমার ভুল ধরিয়ে দিয়ে আমাকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবেন। তাই প্রতি বছর আমি এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করে থাকি।

ছোটবেলাতে ঠাকুমার কাছে রূপকথার গল্প শুনে যে আনন্দ পেতাম, জীবনের যৌবনে শিক্ষকদের সাথে তাঁদের ছাত্রজীবনের গল্প শুনে ওই একই রকম আনন্দ পেয়ে থাকি। তাই শিক্ষক দিবস অন্যান্য উৎসবের মতই আমার কাছে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

যদি তোমাদের পরীক্ষাতে শিক্ষক দিবস রচনাটি ৭০০ টি শব্দের মধ্যে লিখতে হয়, তাহলে তোমরা পুরোটাই লিখো। কিন্তু যদি ক্লাস ৪ বা ৫ এ যদি ৩০০ টি বা ৪০০ টি শব্দের মধ্যে রচনাটি লিখতে হয়, তাহলে তোমরা সব হেডলাইনগুলোই লিখো, কিন্তু প্রতিটি হেডলাইনের আন্ডারে কিছু প্যারাগ্রাফ বাদ দিয়ে দিও।

শিক্ষক দিবসের বক্তৃতা

ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন প্রথম শিক্ষক দিবসের সূচনা করার জন্য তাঁর ছাত্রদের উতসাহিত করেন। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি একজন অধ্যাপকও ছিলেন। শিক্ষকতা ছিল তাঁর কাছে খুবই প্রিয়। সকল ছাত্র ছাত্রীর কাছে খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি খুব প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি যখন রাজনীতিতে যোগদান করেন, তাঁর প্রিয় ছাত্র ছাত্রীরা তাঁর জন্মদিন পালন করার আবদার করে, তখন তিনি সকল শিক্ষকদের শিক্ষকতা কাজটির জন্মদিন এর পালন করার আদেশ দেন।

সেই থেকে সকল ছাত্র ছাত্রীরা ৫ই সেপ্টেম্বর, ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন এর জন্মদিনটি, শিক্ষক দিবস হিসেবে উদযাপন করে থাকে। সমস্ত স্কুলে এই দিন সকাল থেকেই এক উৎসব এর গন্ধ ভেসে আসে। অনেকেই স্টেজ করে, সমস্ত শিক্ষকদের নিয়ে কিছু ভাষণ দিয়ে থাকে। শিক্ষকেরাও ভাষণ এর মাধ্যমে সকল ছাত্র ছাত্রীদের আশীর্বাদ দিয়ে থাকেন।

শিক্ষকেরা আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক। আমাদের জীবন কে ঝড়, বৃষ্টি থেকে তারা আগলে রাখে। তাঁদের ছাড়া আমাদের জীবন অর্থহীন। আমি আমার সকল শিক্ষকদের প্রনাম জানিয়ে এই বক্তৃতা শেষ করছি।  

শিক্ষক সম্পর্কে কিছু কথা

শিক্ষকেরা আমাদের জীবনের মেরুদণ্ড। উনারা ছাড়া আমাদের জীবন সম্পূর্ণ হয় না। একটা গাছ যেমন শিকড় ছাড়া টিকতে পারে না ঠিক তেমনি শিক্ষক ছাড়া জীবন অস্তিত্বহীন।

শিক্ষা হল আমাদের জীবনের আলো। আর সেই শিক্ষা প্রদানকারী হলেন আমাদের শিক্ষক। একটা মানুষ যখন জন্ম নেয়, তখন তার আসল কাজ হয়ে থাকে খাওয়া,আশ্রয়, আর বস্ত্র। এই তিনটের বাইরেও যে আরও কিছু থাকা দরকার যেমন দয়া, করুনা, ভাল স্বভাব, ধৈর্য এই গুলোই তো শিক্ষকেরা শেখান।

শিক্ষকেরাই পারেন একজন মানুষের মধ্যে চেতনা নিয়ে আসতে। শিক্ষকেরাই পারেন একজন মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে।  শিক্ষকেরাই পারেন ভুল পথে যাওয়া মানুষ টিকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে।  

আশা করি “শিক্ষক দিবস রচনা” টি তোমাদের ভাল লেগেছে। এই রচনা টি থেকে তোমরা নিজের মতো করে “শিক্ষক দিবসের বক্তৃতা” ও তৈরি করতে পারো। আবার “শিক্ষক সম্পর্কে কিছু কথা” ও লিখতে পারো। রচনা টি কেমন লাগলো কমেন্ট করে অবশ্যই জানিও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট